বিএসআরএমের চালান থেকে ১৩ টন লোহার রড নিয়ে সুনামগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল একটি ট্রাক। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই উধাও হয়ে যায় বিপুল পরিমাণ রড। ঘটনাটি সাধারণ চুরি নাকি পরিকল্পিতভাবে চালান সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা—তা নিয়ে শুরু হয় তদন্ত। শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ, এরপর মাগুরা ও ফরিদপুর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা একটি চোরাই চক্রের সন্ধান পায় পুলিশ।
[
ঘটনার পাঁচ দিনের মাথায় গ্রেপ্তার করা হয় তিনজনকে। তাদের দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে মাগুরার মহম্মদপুর বাজারের ‘আয়ান এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি দোকান থেকে উদ্ধার করা হয় ১২ টন ১০০ কেজি লোহার রড। একই সঙ্গে ফরিদপুরের মধুখালী এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে রড বহনকারী চুরি যাওয়া ট্রাকটিও। পুলিশের দাবি, চোরাই রডের সঙ্গে জড়িত চক্রের মূলহোতা হিসেবে জাহাঙ্গীরের নামও তদন্তে উঠে এসেছে।
চালান গেল, রড গেল কোথায়?
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ আগস্ট বিকেল ৩টার দিকে জোরারগঞ্জ থানাধীন বিএসআরএম কোম্পানি থেকে বিভিন্ন আকারের ১৩ টন লোহার রড ট্রাকে করে সুনামগঞ্জে পাঠানো হচ্ছিল। কিন্তু নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ট্রাকের রড চুরি হয়ে যায়।
এখানেই তদন্তকারীদের সামনে বড় প্রশ্ন দেখা দেয়—এত বিপুল পরিমাণ লোহার রড কীভাবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরানো হলো? কোথায় নামানো হলো রড? কারা এর ক্রেতা? আর পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত কেউ এ ঘটনায় যুক্ত ছিল কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তদন্তে নামে জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ।
প্রথম সূত্র বারইয়ারহাটে
ঘটনার পর চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বিপিএমের নির্দেশনায় জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ মাঠে নামে। প্রযুক্তিগত তথ্য, গোয়েন্দা তৎপরতা ও বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রথমে বারইয়ারহাট এলাকায় সন্দেহভাজনদের গতিবিধি শনাক্ত করা হয়।
গত ১৯ আগস্ট সেখান থেকে মো. রিয়াদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের কাছে রিয়াদের দেওয়া তথ্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে সামনে আসে। সেই সূত্র ধরে পুলিশ চট্টগ্রামের বাইরে অভিযান পরিচালনা শুরু করে।
চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ
পরদিন ২০ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানাধীন তারাবো এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। সেখানে রিয়াদের আত্মীয় জাকিরের বাসা থেকে ট্রাকের হেলপার মো. হাদিছ মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ পর্যায়ে তদন্তের গতিপথ আরও স্পষ্ট হতে থাকে। চুরি যাওয়া রড শুধু চট্টগ্রামেই আটকে নেই—এটি আন্তঃজেলা যোগাযোগের মাধ্যমে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করতে থাকে পুলিশ।
হাদিছ মোল্লার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরে এবার পুলিশের অভিযান গড়ায় মাগুরার দিকে।
মাগুরায় গিয়ে মিলল বড় সূত্র
মাগুরা জেলার মহম্মদপুর থানার জাঙ্গালিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে আবুল বাশার ওরফে বাঁশিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যেই চোরাই রডের সম্ভাব্য গন্তব্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায় পুলিশ।
তদন্তে উঠে আসে জাহাঙ্গীর নামের এক ব্যক্তির নাম। পুলিশ তাকে চোরাই চক্রের মূলহোতা হিসেবে সন্দেহ করছে। তাঁর অবস্থান শনাক্তের পর বসতঘরে অভিযান চালানো হয়।
এরপরই তদন্তকারীরা পৌঁছে যান মহম্মদপুর বাজারের ‘আয়ান এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি দোকানে।
সেখানেই মেলে চুরি যাওয়া বিপুল পরিমাণ রড।
দোকানে মিলল ১২ টন ১০০ কেজি রড
‘আয়ান এন্টারপ্রাইজ’ থেকে পুলিশ উদ্ধার করে ১২ টন ১০০ কেজি লোহার রড। বিএসআরএমের চালান থেকে চুরি যাওয়া রডের বড় অংশ কীভাবে মাগুরার একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছাল—এখন সেটিই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই রডের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
তবে তদন্তের স্বার্থে চোরাই রডের ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে আরও কারা জড়িত, দোকানটির মালিক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল এবং চক্রটি এর আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ট্রাকও উদ্ধার, কিন্তু খালি
শুধু রড উদ্ধার নয়, চুরি যাওয়া ট্রাকটিরও সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। ফরিদপুরের মধুখালী থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ট্রাকটি খালি অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
ট্রাক খালি অবস্থায় পাওয়া যাওয়ায় তদন্তে আরও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—রডগুলো কোথায় এবং কীভাবে ট্রাক থেকে নামানো হয়েছিল? কারা সেখানে উপস্থিত ছিল? চোরাই মালামাল পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাকটির চালক, হেলপার কিংবা অন্য কেউ পূর্বপরিকল্পিতভাবে যুক্ত ছিল কি না, সেটিও এখন তদন্তের অংশ।
পুলিশের তৎপরতায় দ্রুত উদ্ধার
জোরারগঞ্জ থানার ওসি আব্দুল হালিমের তদারকিতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, এসআই মো. সাদ্দাম হোসেন, এএসআই মো. ইসমাইলসহ পুলিশের সদস্যরা অভিযান পরিচালনা করেন।
পুলিশের দাবি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, গোয়েন্দা তথ্য এবং আন্তঃজেলা পুলিশের সমন্বয়ের কারণে দ্রুত সময়ের মধ্যে চোরাই মালামালের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
একই ঘটনায় চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, মাগুরা ও ফরিদপুরে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করা হয়। এতে স্পষ্ট হয়, ঘটনাটি শুধু একটি থানার সীমাবদ্ধ অপরাধ নয়; এর সঙ্গে একাধিক এলাকার মানুষের যোগাযোগ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
তদন্তে আরও কারা?
১২ টনের বেশি লোহার রড কোনো গোপন স্থানে দীর্ঘদিন লুকিয়ে রাখা সহজ নয়। এ পরিমাণ মালামাল পরিবহন, নামানো, সংরক্ষণ এবং পরে বিক্রির ক্ষেত্রে একাধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না পুলিশ।
বিশেষ করে চট্টগ্রাম থেকে মাগুরা পর্যন্ত রড সরিয়ে নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় কারা কারা ভূমিকা রেখেছে, কীভাবে পরিবহনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং চোরাই রডের ক্রেতা কারা—এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা গেলে চক্রটির পুরো নেটওয়ার্ক সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
পুলিশের বার্তা
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ বলছে, জনগণের জানমাল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের অন্যতম দায়িত্ব। অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে।
পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বিপিএমের সার্বিক নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ অভিযানে কয়েক দিনের মধ্যেই চুরি যাওয়া বিপুল পরিমাণ রড উদ্ধারের ঘটনাকে অপরাধ দমনে পুলিশের আন্তঃজেলা সমন্বিত তৎপরতার উদাহরণ হিসেবে দেখছে জেলা পুলিশ।