• বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৪:২৩ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

বিভাজনের রাজনীতি: ক্ষমতার স্থায়িত্বের কৌশল

বিপ্লব সিকদার / ৪৪ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : বুধবার, ৪ মার্চ, ২০২৬

রাজনীতির ইতিহাসে ক্ষমতা অর্জন ও তা ধরে রাখার কৌশল নিয়ে অসংখ্য বিতর্ক রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম আলোচিত ধারণা হলো—ঐক্য ভেঙে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। “Divide and rule” নামে পরিচিত এই কৌশল বহু যুগ ধরে বিভিন্ন শাসক ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যবহৃত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এটি কি কেবল একটি বাস্তববাদী রাজনৈতিক কৌশল, নাকি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য আত্মঘাতী পথ? রাজনৈতিক বাস্তববাদের ধারায় নিকোলো মেকিয়াভেলি-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর রচনা দ্য প্রিন্স-এ তিনি দেখিয়েছেন যে শাসকের প্রধান দায়িত্ব হলো ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা। নৈতিকতা নয়, কার্যকারিতাই সেখানে মুখ্য। ঐক্যবদ্ধ বিরোধী শক্তি শাসকের জন্য হুমকি কারণ তারা সংগঠিত, সমন্বিত এবং লক্ষ্যভিত্তিক। কিন্তু যখন বিরোধী শক্তিকে বিভিন্ন স্বার্থ, পরিচয় বা আদর্শের ভিত্তিতে বিভক্ত করা যায়, তখন তাদের সমন্বিত প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে শাসকের অবস্থান দৃঢ় হয়।উপনিবেশিক যুগে এই কৌশলের সুস্পষ্ট প্রয়োগ দেখা যায়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্ম, জাতি ও ভাষাভিত্তিক বিভাজনকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ করে তোলে। পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা, জনগণনা ও পরিচয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে সামাজিক পার্থক্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। এর ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস বৃদ্ধি পায় এবং একটি ঐক্যবদ্ধ স্বাধীনতা আন্দোলন গড়ে তোলা কঠিন হয়ে ওঠে অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে। যদিও পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এই বিভাজন অতিক্রম করার চেষ্টা করেছে, তবুও দীর্ঘমেয়াদে সেই বিভাজনের প্রভাব উপমহাদেশের রাজনীতিতে থেকে গেছে।
বিভাজনের রাজনীতি কেবল উপনিবেশিক শাসনে সীমাবদ্ধ নয়; আধুনিক গণতন্ত্রেও এর উপস্থিতি লক্ষণীয়। সমসাময়িক রাজনীতিতে মেরুকরণ একটি বড় বাস্তবতা। রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি ধর্ম, জাতিগত পরিচয়, ভাষা বা আঞ্চলিক স্বার্থ কে কেন্দ্র করে সমর্থন সংগঠিত করে। এতে স্বল্পমেয়াদে ভোটব্যাংক সুসংহত হয়, কিন্তু সমাজের ভেতরে বিভক্তির রেখা আরও গাঢ় হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। অ্যালগরিদমিক ফিল্টার ও তথ্যবুদবুদ (echo chamber) মানুষকে নিজেদের মতের সঙ্গে মিল থাকা তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে, ফলে বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা কমে যায়।
রাজনৈতিকভাবে এই কৌশলের কার্যকারিতা বোঝার জন্য ক্ষমতার গণিত বিশ্লেষণ করা জরুরি। একটি ঐক্যবদ্ধ বিরোধী জোট যদি মোট ভোটের ৬০ শতাংশ ধারণ করে, তবে ক্ষমতাসীন শক্তির জন্য তা বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু যদি সেই ৬০ শতাংশকে তিনটি ভিন্ন গোষ্ঠীতে ভাগ করা যায় ধরা যাক ২৫, ২০ ও ১৫ শতাংশ তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ভেঙে যায়। তখন ক্ষমতাসীন দল তুলনামূলক কম সমর্থন নিয়েও জয়ী হতে পারে। ফলে বিভাজন একটি কৌশলগত সুবিধা দেয়।
তবে এই কৌশলের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব গভীর ও জটিল। প্রথমত, সামাজিক আস্থার অবক্ষয় ঘটে। নাগরিকরা একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী বা হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। যদি জনগণ মনে করে যে শাসক ইচ্ছাকৃতভাবে বিভাজন সৃষ্টি করছে, তবে শাসনের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়। তৃতীয়ত, সংঘাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। ইতিহাসে বহু গৃহযুদ্ধ ও সহিংসতার পেছনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণ ভূমিকা রেখেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বোঝা দরকার“বৈচিত্র্য” ও “বিভাজন” এক নয়। বৈচিত্র্য একটি সমাজের শক্তি হতে পারে, যদি তা অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কিন্তু যখন বৈচিত্র্যকে প্রতিযোগিতামূলক ও শত্রুতামূলক পরিচয়ে রূপান্তর করা হয়, তখন তা বিভাজনে পরিণত হয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা হলো এই সূক্ষ্ম সীমারেখা বোঝা।অর্থনৈতিক দিক থেকেও বিভাজনের রাজনীতি ব্যয়বহুল। বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণে স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। যখন রাজনৈতিক পরিবেশ অনিশ্চিত ও উত্তেজনাপূর্ণ হয়, তখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়। বিদেশি বিনিয়োগ কমে যেতে পারে, অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়, এবং মানবসম্পদের অপচয় ঘটে। ফলে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।নৈতিক প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতি কি কেবল ক্ষমতার খেলা, নাকি জনকল্যাণের মাধ্যম? যদি শাসনের লক্ষ্য হয় নাগরিকদের নিরাপত্তা, অধিকার ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা, তবে বিভাজন সেই লক্ষ্যকে দুর্বল করে। কিন্তু যদি লক্ষ্য কেবল ক্ষমতা ধরে রাখা হয়, তবে বিভাজন একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। এই দ্বন্দ্বই রাজনৈতিক দর্শনের চিরন্তন বিতর্ক উপায় ও উদ্দেশ্যের সম্পর্ক।আধুনিক বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাজনের রাজনীতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ভুয়া খবর, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা এবং বিদেশি প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ বিভিন্ন দেশে আলোচিত হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখছে। ফলে বিভাজন এখন কেবল ভৌগোলিক বা সামাজিক নয়; এটি তথ্যগতও।তবে আশাবাদের জায়গাও আছে। অনেক গণতান্ত্রিক সমাজে নাগরিক উদ্যোগ, স্বাধীন গণমাধ্যম ও বিচারব্যবস্থা বিভাজনের রাজনীতিকে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করছে। সংলাপ, অন্তর্ভুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ঐক্য পুনর্গঠনের পথ দেখাতে পারে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি স্বল্পমেয়াদি সুবিধার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে বিভাজনের চক্র ভাঙা সম্ভব।
সবশেষে বলা যায়, “ঐক্য ভেঙে নিয়ন্ত্রণ” একটি পরীক্ষিত রাজনৈতিক কৌশল কিন্তু এটি দ্বিমুখী তরবারির মতো। এটি ক্ষমতা সুসংহত করতে পারে, আবার একই সঙ্গে সামাজিক ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে। স্থিতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজন এমন রাজনীতি, যা বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেয় কিন্তু বিভাজনকে উসকে দেয় না। ক্ষমতার স্থায়িত্ব শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে নাগরিক আস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি এবং নৈতিক বৈধতার ওপর শুধু কৌশলগত বিভাজনের ওপর নয়।

 

লেখক, সাংবাদিক।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন