• রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ০৪:০৭ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
ভুয়া ডাক্তার চক্রে জিম্মি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা মেঘনায় ২০ সরকারি দপ্তরে জনবল সংকট মাঠের দায়িত্ব শেষে ব্যারাকে ফিরছে সেনাসদস্যরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে শৃঙ্খলাই এখন সবচেয়ে জরুরি অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স, মেঘনায় উন্নয়ন বঞ্চিত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে — ড. মোশাররফ কোরবানির পশুর হাট ইজারাদার: শুধু ব্যবসা না আধিপত্য মেঘনায় ইয়াবাসহ আটক মোসলেম মিয়াকে কারাগারে প্রেরণ “তিন মাসে চার খুন” বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন, একটি হত্যাকাণ্ডের তথ্য মিলছে না মেঘনায় জমি সংক্রান্ত জেরে ভাইয়ের বিরুদ্ধে খুন-জখমের আশঙ্কার অভিযোগ দেশে গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নতুন রাজনৈতিক ধারা গড়ে তুলছে এনসিপি: হাসনাত আবদুল্লাহ এমপি

ভুয়া ডাক্তার চক্রে জিম্মি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা

এম এইচ বিপ্লব সিকদার / ৩০ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের সবচেয়ে ভয়াবহ কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলিত সংকটগুলোর একটি হলো মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট, প্যারামেডিক কিংবা স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কিছু ব্যক্তি নিজেদের “ডাক্তার” পরিচয় দিয়ে রোগী দেখানো, প্রেসক্রিপশন দেওয়া এবং বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চেম্বার পরিচালনা করা। রাজধানী থেকে শুরু করে উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি গ্রামীণ বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে এই প্রতারণার জাল। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসকের পরিবর্তে প্রতারকের হাতে চিকিৎসা নিচ্ছেন—অনেকে জানেন না, আবার কেউ কেউ জানলেও বাধ্য হয়ে যাচ্ছেন। কারণ দেশে এখনো দক্ষ ও নিবন্ধিত চিকিৎসকের ভয়াবহ সংকট রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অবৈধ কর্মকাণ্ড বছরের পর বছর চললেও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। বরং একশ্রেণির অসাধু ক্লিনিক মালিক, ডায়াগনস্টিক ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ফলে স্বাস্থ্যসেবা এখন একদিকে ব্যবসা, অন্যদিকে ভয়ঙ্কর প্রতারণার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) আইন অনুযায়ী, নিবন্ধিত এমবিবিএস বা বিডিএস ডিগ্রিধারী ছাড়া কেউ নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিতে পারবেন না। বিএমডিসির নিবন্ধন ছাড়া প্রেসক্রিপশন দেওয়া, রোগ নির্ণয় করা কিংবা চিকিৎসা পরিচালনা করাও আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, বহু মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট নামের ব্যক্তি নিজের নামের আগে “ডা.” ব্যবহার করছেন, সাইনবোর্ড টানাচ্ছেন, চেম্বার করছেন এবং প্রকাশ্যে রোগী দেখছেন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তারা জটিল রোগের চিকিৎসা পর্যন্ত করছেন, যা সরাসরি মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
গ্রামের সাধারণ মানুষ চিকিৎসা বিজ্ঞানের জটিলতা বোঝেন না। সাদা অ্যাপ্রোন, স্টেথোস্কোপ আর একটি চেম্বার দেখেই তারা বিশ্বাস করেন—তিনি ডাক্তার। এই বিশ্বাসকেই পুঁজি করছে প্রতারকচক্র। রোগীকে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা দেওয়া, কমিশনভিত্তিক ওষুধ লিখে দেওয়া, ভুল অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ, স্টেরয়েডের অপব্যবহার কিংবা ভুল চিকিৎসার কারণে প্রতিনিয়ত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগ জটিল হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটছে। কিন্তু অধিকাংশ ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপচিকিৎসার কারণে কিডনি, লিভার ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। অ্যান্টিবায়োটিকের ভুল ব্যবহার দেশে “অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স” বা ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ভবিষ্যতে এটি জাতীয় স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে—এই অবস্থা কেন তৈরি হলো?
প্রথমত, দেশে গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসকের ঘাটতি প্রকট। বহু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক থাকেন না বা নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। এই শূন্যস্থানকে কাজে লাগিয়ে প্যারামেডিক ও হাতুড়ে চিকিৎসকরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মানুষ বাধ্য হয়ে তাদের কাছে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নজরদারি দুর্বল। ভুয়া ডাক্তার শনাক্ত ও অভিযানের ঘোষণা মাঝেমধ্যে শোনা গেলেও তা নিয়মিত নয়। অনেক সময় অভিযানের পর কয়েকদিন গা ঢাকা দিয়ে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে প্রতারকরা। কোনো স্থায়ী ডাটাবেইস, মনিটরিং বা লাইসেন্স যাচাই ব্যবস্থাও কার্যকরভাবে নেই।
তৃতীয়ত, বিএমডিসির আইন প্রয়োগে দৃশ্যমান কঠোরতা নেই। দেশে কতজন ভুয়া ডাক্তার সক্রিয়, কতজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে কিংবা কতজন সাজা পেয়েছে—এসব তথ্যও স্পষ্টভাবে জনগণের সামনে আসে না। ফলে অপরাধীদের মধ্যে ভয় তৈরি হচ্ছে না।
চতুর্থত, বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের একটি অংশ মুনাফার জন্য অদক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিচ্ছে। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরিবর্তে কম খরচে প্যারামেডিক নিয়োগ দিয়ে তারা রোগী দেখাচ্ছে। এতে রোগী যেমন প্রতারিত হচ্ছেন, তেমনি পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন—বিএমডিসির আইন কী বলে?
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন অনুযায়ী, বিএমডিসিতে নিবন্ধিত নয় এমন কেউ নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিতে পারবেন না। ভুয়া পরিচয়ে চিকিৎসা প্রদান, প্রেসক্রিপশন দেওয়া বা রোগী দেখানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এছাড়া ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, দণ্ডবিধি এবং প্রতারণাবিরোধী ধারাতেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজনে অবৈধ ক্লিনিক সিলগালা, জরিমানা ও কারাদণ্ডও দেওয়া যেতে পারে।
কিন্তু বাস্তবে আইনের প্রয়োগ যতটা কঠোর হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। ফলে অপরাধীরা বুঝে গেছে—এই খাতে ঝুঁকি কম, লাভ বেশি।
এই সংকট থেকে উত্তরণে এখন জরুরি সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ।
প্রথমত, সারাদেশে ভুয়া ডাক্তার শনাক্তে বিশেষ অভিযান চালাতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিএমডিসি, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় তালিকা তৈরি করে অবৈধ চেম্বার বন্ধ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অনলাইনে বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন যাচাই সহজ করতে হবে। একজন রোগী যেন মোবাইল ফোনে চিকিৎসকের নিবন্ধন নম্বর যাচাই করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা জরুরি। প্রতিটি প্রেসক্রিপশনে বিএমডিসি নম্বর ও কিউআর কোড থাকা উচিত।
তৃতীয়ত, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স নবায়নের সময় কঠোর যাচাই করতে হবে। কোথাও ভুয়া ডাক্তার বা অদক্ষ ব্যক্তি দিয়ে চিকিৎসা করানোর প্রমাণ মিললে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স বাতিল করতে হবে।
চতুর্থত, প্যারামেডিকদের দায়িত্বসীমা স্পষ্ট করতে হবে। একজন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট বা প্যারামেডিক স্বাস্থ্যসেবার সহায়ক কর্মী হতে পারেন, কিন্তু তিনি কখনো চিকিৎসক নন। তাদের কাজ হবে চিকিৎসকের সহায়তা করা, নিজে চিকিৎসক সেজে রোগী দেখা নয়।
পঞ্চমত, গ্রামীণ স্বাস্থ্যখাতে প্রকৃত চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি, আবাসন সুবিধা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে মানুষ ভুয়া চিকিৎসকের কাছে কম যাবে।ষষ্ঠত, জনগণকে সচেতন করতে হবে। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে প্রচারণা চালাতে হবে বিএমডিসি নিবন্ধন ছাড়া কারও কাছে চিকিৎসা নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। স্কুল-কলেজ পর্যায়েও স্বাস্থ্যসচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন।সপ্তমত, অপচিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অনেক পরিবার ভয় বা প্রভাবের কারণে অভিযোগ করতে পারে না। এজন্য বিশেষ অভিযোগ সেল চালু করা জরুরি।
এখানে একটি বাস্তবতা স্বীকার করতেই হবে—দেশে স্বাস্থ্যখাতের দুর্বলতাকে পুঁজি করেই ভুয়া ডাক্তার চক্র বিস্তার লাভ করেছে। তাই শুধু অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার। চিকিৎসা যেন ব্যবসা নয়, মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় সেদিকে সরকারকে নজর দিতে হবে।রাষ্ট্র যদি এখনই কঠোর না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই প্রতারণা আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। কারণ বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেক ভুয়া চিকিৎসক বিজ্ঞাপন দিয়ে রোগী ধরছেন। কেউ “বিশেষজ্ঞ যৌনরোগ চিকিৎসক”, কেউ “ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ”, কেউ আবার “গাইনি ডাক্তার” পরিচয়ে প্রতারণা করছেন। অনেকে বিদেশি ডিগ্রির ভুয়া সনদ ব্যবহার করছেন। এগুলো শুধু আইন লঙ্ঘন নয়, মানুষের জীবনের সঙ্গে নির্মম প্রতারণা।
স্বাস্থ্যখাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে এখনই দৃশ্যমান ব্যবস্থা প্রয়োজন। একজন প্রকৃত চিকিৎসক হতে বছরের পর বছর কঠোর অধ্যয়ন, ইন্টার্নশিপ ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেখানে স্বল্প প্রশিক্ষণ নিয়ে কেউ যদি “ডাক্তার” পরিচয়ে ব্যবসা করেন, তবে তা শুধু প্রতারণাই নয় যোগ্য চিকিৎসকদের প্রতিও চরম অবমাননা।

লেখক -সাংবাদিক।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন