• সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৯ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
মেঘনায় রতনপুর–তালতলী কাচা সড়ক কাদায় মরণফাঁদ, দুর্ভোগে হাজারো পথচারী অভিশপ্ত বন্যা থেকে মুক্তির পথ কি নেই? স্বচ্ছ পরিকল্পনা বাস্তবায়নেই দূর হবে ঢাকার জলাবদ্ধতা সংকট প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিপীড়ন থেকে মুক্ত করতে হবে নাঙ্গলমোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ শিক্ষার্থীর বৃত্তি অর্জনে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা ঠাকুরগাঁও রোডে পূবালী ব্যাংকের বাংলা কিউআর বুথ উদ্বোধন মীর হেলালের নির্দেশনায় হাটহাজারীতে বন্যার্তদের পাশে ছাত্রদল নেতা তকিবুল বেনাপোল বন্দরে জব্দকৃত ৩ হাজার ৬৭৫ কেজি ভায়াগ্রা পাচারের শঙ্কায় নিরাপত্তা জোরদার গাইবান্ধায় ডিবির অভিযানে ৭০ পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকের নির্বাচন ২৭ সেপ্টেম্বর

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিপীড়ন থেকে মুক্ত করতে হবে

বিপ্লব সিকদার / ১১ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই উন্নয়নের সুফল সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছে যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে এখনো এমন একটি বড় জনগোষ্ঠী রয়েছে যারা নানা ধরনের বৈষম্য, বঞ্চনা ও নিপীড়নের শিকার। এদেরই আমরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে চিনি। অর্থনৈতিক দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগ, কর্মসংস্থানের অভাব, ভূমিহীনতা, আইনি সুরক্ষার দুর্বলতা এবং সামাজিক কুসংস্কারের কারণে তারা প্রতিনিয়ত পিছিয়ে পড়ছে। একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সব ধরনের নিপীড়ন থেকে মুক্ত করা সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বলতে সাধারণত সমাজের সেইসব মানুষকে বোঝায়, যারা অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কিংবা ভৌগোলিক নানা কারণে মূলধারার উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত। এর মধ্যে ভূমিহীন কৃষক, জেলে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য, চা-শ্রমিক, চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকার মানুষ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বেদে সম্প্রদায়, দলিত জনগোষ্ঠী, পথশিশু, অসহায় নারী, প্রবীণ ও অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। তাদের প্রত্যেকের সমস্যার ধরন ভিন্ন হলেও একটি বিষয়ে তারা অভিন্ন—তারা সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
বাংলাদেশ সংবিধানে সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও আইনের সমান সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব জীবনে অনেক প্রান্তিক মানুষ এখনো সেই অধিকার পুরোপুরি ভোগ করতে পারেন না। তারা অনেক সময় শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান কিংবা বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার হন। অনেকেই নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নন, আবার সচেতন হলেও নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে সেই অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না।
দারিদ্র্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় সমস্যা। দারিদ্র্যের কারণে অনেক পরিবার সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারে না। শিশুদের অনেকেই অল্প বয়সে শ্রমে যুক্ত হয়। ফলে শিক্ষার অভাব তাদের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পথও সংকুচিত করে। শিক্ষা থেকে বঞ্চিত মানুষ দক্ষতা অর্জনের সুযোগ হারায় এবং নিম্ন আয়ের কাজেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। এভাবে দারিদ্র্যের একটি চক্র প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতে থাকে।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নানা সংকটে পড়ে। দুর্গম অঞ্চলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্বল্পতা, চিকিৎসকের অভাব, প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট এবং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে তারা সময়মতো চিকিৎসা নিতে পারে না। অনেক নারী মাতৃস্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হন। শিশুদের অপুষ্টি ও প্রতিরোধযোগ্য রোগও এসব এলাকায় তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। সুস্থ নাগরিক ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বৈষম্য একটি বড় সমস্যা। দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক প্রান্তিক মানুষ কম মজুরির কাজ করতে বাধ্য হন। অনেকেই মৌসুমি কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাদের জীবিকা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে তারা ঋণের বোঝা, খাদ্যসংকট এবং সামাজিক অনিরাপত্তার মধ্যে জীবনযাপন করেন।
নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও গভীর। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারীরা অনেক সময় দ্বিগুণ বৈষম্যের শিকার হন। একদিকে অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, অন্যদিকে সামাজিক কুসংস্কার ও লিঙ্গবৈষম্য তাদের জীবনকে কঠিন করে তোলে। বাল্যবিবাহ, পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুক, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং নিরাপত্তাহীনতা তাদের উন্নয়নের বড় বাধা। শিশুদের ক্ষেত্রে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, শিশুশ্রম ও অপুষ্টি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদ্বেগজনক।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়নের আরেকটি কারণ হলো সামাজিক বৈষম্য ও নেতিবাচক মানসিকতা। অনেক সময় তাদের পেশা, পরিচয় বা আর্থিক অবস্থার কারণে অবজ্ঞা করা হয়। এই বৈষম্য কেবল তাদের আত্মমর্যাদাবোধকে আঘাত করে না, বরং সমাজে তাদের অংশগ্রহণও সীমিত করে দেয়। একটি সভ্য সমাজে এমন বৈষম্যের কোনো স্থান থাকতে পারে না।
সরকার ইতোমধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ভাতা, আশ্রয়ন প্রকল্প, খাদ্য সহায়তা, শিক্ষা উপবৃত্তি এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের চেষ্টা করছে। এসব উদ্যোগ অনেক ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাতে কোনো অসাধু ব্যক্তি সুবিধা ভোগ করতে না পারে এবং প্রকৃত দরিদ্র মানুষ বঞ্চিত না হন।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে শিক্ষা সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। প্রত্যেক শিশুর জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যালয়ে ঝরে পড়া রোধ, কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য করতে কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করা প্রয়োজন। দুর্গম অঞ্চলে মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা, টেলিমেডিসিন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা হলে অনেক মানুষ উপকৃত হবে।কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, মৎস্য, পশুপালন এবং গ্রামীণ উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ, বাজারসুবিধা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ আত্মনির্ভরশীল হতে পারবেন। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
আইনের শাসন নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের বৈষম্য, সহিংসতা, ভূমি দখল, শোষণ কিংবা হয়রানির ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিনামূল্যে আইনি সহায়তা এবং অধিকার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করলে তারা নিজেদের অধিকার রক্ষায় আরও সক্ষম হবেন।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদমাধ্যমকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমস্যা, সম্ভাবনা ও অধিকার নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। ইতিবাচক পরিবর্তনের গল্প তুলে ধরার পাশাপাশি অন্যায় ও বৈষম্যের ঘটনাগুলোও সাহসের সঙ্গে প্রকাশ করতে হবে। এতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং নীতিনির্ধারকদেরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করবে।
নাগরিক সমাজ, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। মানবিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলতে সামাজিক উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ শুধু সরকারের একার পক্ষে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অন্যতম শর্ত হলো কাউকে পিছিয়ে না রাখা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা এবং উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। উন্নয়নের মূলধারায় তাদের সম্পৃক্ত না করলে একটি বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠন সম্ভব হবে না।
লেখক – সাংবাদিক।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন