• রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১৮ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ

নজরুলের ৫৭ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক, আরও মামলা

নিজস্ব সংবাদ দাতা / ৪ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিপ্লব সিকদার :
ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী তাসলিমা ইসলামের নামে থাকা ৫৭ কোটি ৬১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. শাহজাহান কবির এ আদেশ দেন।
ক্রোকের আওতায় থাকা সম্পদের মধ্যে রয়েছে ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, ময়মনসিংহ, পটুয়াখালী, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি, ফ্ল্যাট, আবাসিক প্লট ও জমি। দুদকের হিসাবে নজরুল ইসলামের নামে প্রায় ৩৮ কোটি ৩৯ লাখ ১৩ হাজার টাকা এবং তাঁর স্ত্রী তাসলিমা ইসলামের নামে প্রায় ১৯ কোটি ২২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদ রয়েছে।
দুদকের আবেদনে বলা হয়েছে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফের গ্রাহকদের সঞ্চয়ের অর্থ বিভিন্ন ব্যাংকে জমা রাখা এমটিডিআর বা এফডিআর ভাঙিয়ে আত্মসাৎ এবং প্রতিষ্ঠানের নামে অতিরিক্ত দামে জমি কেনাসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে নজরুল ইসলাম জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে অন্যদের সঙ্গে সাতটি মামলা করা হয়েছে। মামলাগুলোর তদন্ত চলছে।
দুদকের দাবি, অনুসন্ধানের সময় নজরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী তাঁদের নামে থাকা স্থাবর সম্পদ হস্তান্তর, স্থানান্তর বা বেহাত করার চেষ্টা করছেন বলে তথ্য পাওয়া যায়। এসব সম্পদ হস্তান্তর করা হলে রাষ্ট্রের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকায় সম্পদ ক্রোকের আবেদন করা হয়।
নজরুলের নামে যত সম্পদ
দুদকের অনুসন্ধানে নজরুল ইসলামের নামে বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩৮ কোটি ৩৯ লাখ ১৩ হাজার টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব সম্পদের মধ্যে ঢাকার গুলশান, বারিধারা, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, নিকুঞ্জ ও বসুন্ধরা এলাকায় জমি, বাড়ি ও ফ্ল্যাট রয়েছে।
এ ছাড়া ময়মনসিংহের ভালুকা, মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী, পটুয়াখালীর কলাপাড়া, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, বন্দর ও সদর এবং গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় জমি ও আবাসিক প্লট থাকার তথ্য পেয়েছে দুদক।
স্ত্রীর নামে ১৯ কোটি টাকার সম্পদ
তাসলিমা ইসলামের নামে ঢাকা ও মুন্সীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১৯ কোটি ২২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুদক। তাঁর নামে ২২টি দলিলের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মধ্যে মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার পাইকপাড়া ও সলিমাবাদ এলাকায় শতাধিক শতাংশ নাল জমি, রাজধানীর গুলশান আবাসিক এলাকায় বাড়ি এবং প্রায় ৩ হাজার বর্গফুট আয়তনের একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। খিলক্ষেত, ক্যান্টনমেন্ট, বাড্ডা ও সূত্রাপুর এলাকাতেও সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি কেনার তথ্য
দুদকের অনুসন্ধানে নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগের তথ্যও উঠে এসেছে। সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০১৫ সালে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তর করে ওয়েলিংটন এলাকায় একটি বাড়ি কেনার তথ্য পাওয়া যায়।
২০২৫ সালে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নজরুল ইসলাম ও তাঁর পরিবারের যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের তথ্য এবং বিদেশে সম্পদ থাকার বিষয়ে তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছিল দুদক। বিদেশে থাকা ওই সম্পদের অবস্থান ও মালিকানা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পারস্পরিক আইনগত সহায়তার অনুরোধ পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
১৪টি অভিজাত ক্লাবের সদস্য
দুদকের অনুসন্ধানে নজরুল ইসলামের ঢাকা বোট ক্লাব, ঢাকা ক্লাব, গুলশান ক্লাবসহ ১৪টি অভিজাত ক্লাবের সদস্য হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে দুদক জানিয়েছিল, নজরুল ইসলাম তাঁর রিমান্ডে নিজের ও পরিবারের যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব এবং বিদেশে সম্পদের বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন।
একের পর এক মামলা
নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের অর্থ আত্মসাৎ ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে একাধিক মামলা করেছে দুদক। ২০২৫ সালে ফারইস্টের সাবেক চেয়ারম্যান, পরিচালকসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে ৪৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করা হয়।
এরপর ২০২৬ সালের মার্চে ফারইস্ট টাওয়ার-২ নির্মাণের নামে ভুয়া কার্যাদেশ ও জাল বিল-ভাউচার তৈরি করে প্রায় ১৩ কোটি ৭১ লাখ ৫১ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে নজরুল ইসলামসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা করে দুদক।
এ ছাড়া ২০২৫ সালে তোপখানা রোডে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের জমি কেনায় ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগেও নজরুল ইসলামসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধেও উদ্যোগ
নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পাশাপাশি ফারইস্ট ইসলামী লাইফের গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের পাওনা পরিশোধে উদ্যোগ নিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। ১৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ধাপে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের ৫৮০ জন পলিসিহোল্ডারকে প্রায় ৫ কোটি টাকা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর আগে ফারইস্টের আর্থিক অনিয়ম নিয়ে বিভিন্ন মামলা ও তদন্তে বিপুল অর্থের আত্মসাতের অভিযোগ সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের মার্চে একটি ঘটনায় ৬৪৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের খবরও প্রকাশিত হয়।
সব মিলিয়ে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, সম্পদের উৎস গোপন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে একাধিক তদন্ত ও মামলা চলমান রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচার ও তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন