• সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ০৫:১৩ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

প্যারামেডিক ‘ডাক্তার’ পরিচয় ও ফি—আইন কোথায় দাঁড়ায়?

বিপ্লব সিকদার / ৫৮ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : সোমবার, ৪ মে, ২০২৬

বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই “প্যারামেডিক ডাক্তার” পরিচয়ে চিকিৎসা দেওয়া, প্রেসক্রিপশন লেখা এবং ফি নেওয়ার একটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই বাস্তবতা আইনের সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এই প্রশ্ন এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই খাতে রয়েছে আইনি সীমাবদ্ধতা, অস্পষ্টতা এবং কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি প্রতারণার উপাদান।
প্রথমেই আসা যাক পরিচয়ের প্রশ্নে। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী “ডাক্তার” বলতে বোঝায় কেবলমাত্র বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC)-এ নিবন্ধিত MBBS বা BDS ডিগ্রিধারী চিকিৎসককে। Bangladesh Medical and Dental Council-এর অধীন আইন অনুযায়ী, নিবন্ধন ছাড়া কেউ নিজেকে চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিতে বা চিকিৎসা চর্চা করতে পারে না।
আইন আরও স্পষ্ট করে বলছে—এ ধরনের কাজ করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ; এমনকি কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধানও রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে “প্যারামেডিক ডাক্তার” শব্দটাই আইনগতভাবে সমস্যাযুক্ত। কারণ প্যারামেডিক, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট বা কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কাররা সহায়ক স্বাস্থ্যকর্মী, ডাক্তার নয়। ফলে “ডা.” উপাধি ব্যবহার করা বা নিজেকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসক হিসেবে উপস্থাপন করা সরাসরি বিভ্রান্তিকর—এবং অনেক ক্ষেত্রে এটি প্রতারণার পর্যায়ে পড়ে।দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রেসক্রিপশন। সাধারণ মানুষের ধারণা—যে কেউ রোগী দেখে ওষুধ লিখতে পারে। কিন্তু বাস্তবে আইন তা বলে না। BMDC-এর গাইডলাইন অনুযায়ী, শুধুমাত্র নিবন্ধিত চিকিৎসকই পূর্ণাঙ্গ প্রেসক্রিপশন দিতে পারেন। অন্যদিকে, ডিপ্লোমাধারী মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট বা প্যারামেডিকদের জন্য সীমিত ওষুধ তালিকা নির্ধারিত রয়েছে, যার বাইরে তারা প্রেসক্রিপশন দিতে পারে না। এছাড়া সরকার অনুমোদিত কমিউনিটি প্যারামেডিকদের ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট “ড্রাগ লিস্ট” রয়েছে, যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে তারা প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে পারে। অর্থাৎ, বাস্তবে তারা পূর্ণাঙ্গ প্রেসক্রিপশন দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না—বরং নির্দিষ্ট গাইডলাইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে বাধ্য।

তৃতীয়ত, প্রেসক্রিপশন ফি নেওয়ার বিষয়টি। আইন অনুযায়ী, নিবন্ধিত চিকিৎসকরা রোগী দেখার জন্য ফি নিতে পারেন এবং এটি বৈধ পেশাগত আয়। কিন্তু প্যারামেডিকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি এতটা সরল নয়।
যদি তারা তাদের নির্ধারিত সীমার মধ্যে থেকে (যেমন প্রাথমিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্য পরামর্শ) সেবা দেন, তাহলে যুক্তিসঙ্গত সার্ভিস চার্জ নেওয়া অবৈধ নয়। তবে সমস্যা হয় তখন, যখন—
তারা নিজেকে “ডাক্তার” পরিচয় দিয়ে ফি নেয়
পূর্ণাঙ্গ প্রেসক্রিপশন দেয়
বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার ভান করে
এই অবস্থায় ফি নেওয়া শুধু অনৈতিক নয়, বরং প্রতারণা ও ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে দুটি অপরাধ একসাথে ঘটে:
প্রথমত, ভুয়া পরিচয় ব্যবহার (misrepresentation)—যা সরাসরি প্রতারণা।
দ্বিতীয়ত, অবৈধ চিকিৎসা চর্চা (illegal medical practice)—যা BMDC আইনে দণ্ডনীয়।
এছাড়া ওষুধ ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী, নিবন্ধিত চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অনেক ওষুধ সরবরাহ করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই পরিস্থিতির পেছনে একটি বড় বাস্তবতাও রয়েছে গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসকের অভাব। ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্যারামেডিকরাই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছেন। কিন্তু এই বাস্তবতা আইন লঙ্ঘনের বৈধতা দেয় না; বরং এটি রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতাকে তুলে ধরে।বাংলাদেশে প্যারামেডিকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাদের ক্ষমতা সীমিত। “ডাক্তার” পরিচয়ে চিকিৎসা দেওয়া, পূর্ণ প্রেসক্রিপশন লেখা এবং সেই ভিত্তিতে ফি নেওয়া—এসব কার্যক্রম আইনসম্মত নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি প্রতারণার পর্যায়ে পড়ে।স্বাস্থ্যখাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন একদিকে আইনের কঠোর প্রয়োগ,
অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে বৈধ চিকিৎসা সেবা সম্প্রসারণ।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন