কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ত্রাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিশেষ বরাদ্দ বণ্টনকে ঘিরে এক ধরনের নীরব রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার আট ইউনিয়নের অধিকাংশ চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্য অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও প্রশাসনিক কাঠামোতে তারাই বহাল থাকায় সরকারি সুবিধা বণ্টনে নতুন ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। এতে বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের তৃণমূল নেতাকর্মী এবং দীর্ঘদিন বঞ্চিত বিরোধী মতাদর্শের সাধারণ মানুষ নিজেদের উপেক্ষিত মনে করছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মেঘনা উপজেলার চালিভাঙ্গা, মানিকারচর, বড়কান্দা, গোবিন্দপুর, লুটেরচর, ভাওরখোলা, চন্দনপুর, রাধানগর, ইউনিয়নে এখনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমেই অধিকাংশ সরকারি বরাদ্দ বিতরণ হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রশাসন জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমেই খাদ্য সহায়তা, ভিজিএফ-ভিজিডি, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা কিংবা দুর্যোগকালীন সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই কাঠামো নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে।উপজেলার কয়েকজন বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী অভিযোগ করেন, বিগত বছরগুলোতে যারা রাজনৈতিকভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, মামলা-হামলার মধ্যে ছিলেন কিংবা সামাজিকভাবে কোণঠাসা ছিলেন, এখন তারাই সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের ভাষ্য, প্রশাসন সরাসরি মাঠপর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের ওপর নির্ভর করায় সুবিধাভোগীর তালিকায় পক্ষপাতের অভিযোগ বাড়ছে।
গোবিন্দপুর ইউনিয়নের এক স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সরকার বদলেছে, কিন্তু সুবিধা বণ্টনের নিয়ন্ত্রণ বদলায়নি। যারা আগে ক্ষমতার বলয়ে ছিল, তারাই এখনো তালিকা করে নিজেদের অনুসারীদের সুযোগ দিচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ মনে করছে সরকার বৈষম্য করছে।”একাধিক ইউনিয়নে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে সরকারি বরাদ্দের তালিকা প্রস্তুতের সময় স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া হয় না। এতে ইউনিয়ন পর্যায়ে দ্বন্দ্ব বাড়ছে। বিশেষ করে যুবসমাজের মধ্যে ক্ষোভ বাড়লেও প্রকাশ্যে কেউ কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না। কারণ জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রশাসনিক সম্পর্ক এখনো দৃশ্যমানভাবে শক্তিশালী।স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আইন ও বিধি অনুযায়ী নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমেই সরকারি কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। প্রশাসনের ভাষ্য, ইউনিয়ন পরিষদ স্থানীয় সরকারের সাংবিধানিক কাঠামোর অংশ হওয়ায় তাদের পাশ কাটিয়ে সরাসরি রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় সেবা বণ্টনের সুযোগ নেই। তবে অনিয়ম বা পক্ষপাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্তের সুযোগ রয়েছে।মেঘনা উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, টিআর-কাবিখা প্রকল্প কিছু নেতাকর্মীদের বন্টনের সুযোগ থাকলেও প্রয়োজন এর তুলনায় খুবই কম। এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ ঘিরে স্থানীয়ভাবে অসন্তোষ বাড়ার পেছনে রাজনৈতিক বিভাজনও বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘদিন একক রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ইউনিয়নভিত্তিক প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে দলীয়করণ গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে। এখন রাজনৈতিক বাস্তবতা পাল্টে গেলেও মাঠপর্যায়ের সমন্বয় কাঠামো বদলাতে না পারায় সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।উপজেলার কয়েকজন সচেতন নাগরিক বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে সামাজিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। কারণ সরকারি সহায়তা শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি সামাজিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক প্রভাবেরও প্রতীক হয়ে উঠেছে। ফলে একটি পক্ষ ধারাবাহিকভাবে সুবিধা পেলে অন্য পক্ষের মধ্যে ক্ষোভ জমা হওয়া স্বাভাবিক।স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সমাজকর্মীদের মতে, সমস্যার সমাধানে ইউনিয়নভিত্তিক পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যেখানে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল, শিক্ষক, ইমাম ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এতে সুবিধাভোগীর তালিকা নিয়ে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং রাজনৈতিক অবিশ্বাস কিছুটা কমবে।বিশ্লেষকদের মতে, মেঘনার মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল উপজেলায় শুধু প্রশাসনিক নিয়ম মেনে কাজ করলেই হবে না, বরং সামাজিক ভারসাম্য ও অংশগ্রহণমূলক তদারকিও জরুরি। অন্যথায় সরকারি সহায়তা বণ্টনকে কেন্দ্র করে যে নীরব স্নায়ুযুদ্ধ চলছে, তা ভবিষ্যতে প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।