• মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ১২:২৩ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
কোরবানির পশুর হাট ইজারাদার: শুধু ব্যবসা না আধিপত্য মেঘনায় ইয়াবাসহ আটক মোসলেম মিয়াকে কারাগারে প্রেরণ “তিন মাসে চার খুন” বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন, একটি হত্যাকাণ্ডের তথ্য মিলছে না মেঘনায় জমি সংক্রান্ত জেরে ভাইয়ের বিরুদ্ধে খুন-জখমের আশঙ্কার অভিযোগ দেশে গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নতুন রাজনৈতিক ধারা গড়ে তুলছে এনসিপি: হাসনাত আবদুল্লাহ এমপি নির্বাচনী গণসংযোগে হামলার মামলায় আ’লীগের ৮৬ নেতাকর্মী আসামি মেঘনায় পৃথক অভিযানে গাঁজা-চোরাই মাল জব্দ চাঁদাবাজি,সন্ত্রাসী ও মাদককারবারি প্রতিহত করা হবে : ড.খন্দকার মারুফ প্রাইভেটকারে ৬০ কেজি গাঁজা, পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে চালক উধাও মেঘনায় ইয়াবাসহ আটক যুবক কারাগারে

কোরবানির পশুর হাট ইজারাদার: শুধু ব্যবসা না আধিপত্য

বিপ্লব সিকদার / ৫৪ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬

বাংলাদেশে কোরবানির ঈদকে ঘিরে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার পশু বাণিজ্য গড়ে ওঠে। রাজধানী থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত অস্থায়ী ও স্থায়ী পশুর হাটগুলোকে কেন্দ্র করে জমে ওঠে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পশুর হাটের ইজারা শুধু অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; অনেক এলাকায় এটি রাজনৈতিক প্রভাব, সামাজিক কর্তৃত্ব ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারের অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ফলে কোরবানির পশুর হাট এখন শুধু গরু-ছাগল কেনাবেচার স্থান নয়, বরং ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে পশুর হাট ইজারা দিয়ে থাকে। কাগজে-কলমে প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ হলেও বাস্তবতায় প্রায়ই প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী কিংবা সিন্ডিকেটভিত্তিক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ওঠে। অনেক এলাকায় দেখা যায়, নির্দিষ্ট কয়েকটি গ্রুপ বছরের পর বছর একই হাট নিয়ন্ত্রণ করছে। নতুন কেউ দরপত্রে অংশ নিতে চাইলে তাকে নানাভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়। কোথাও কোথাও হুমকি, চাপ কিংবা প্রভাব খাটানোর ঘটনাও ঘটে।
বিশ্লেষকদের মতে, পশুর হাটের ইজারা থেকে যে অর্থ আসে, তার একটি অংশ সরাসরি লাভ হলেও এর বাইরে আরও বড় বিষয় হলো স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। একটি বড় পশুর হাট মানে পরিবহন, ট্রাক প্রবেশ, শ্রমিক নিয়োগ, খাজনা আদায়, দোকান বরাদ্দ, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং আনুষঙ্গিক বিভিন্ন খাতের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ। ফলে হাট নিয়ন্ত্রণ মানেই একটি মৌসুমি অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ।বিশেষ করে রাজধানী সংলগ্ন জেলা ও গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক হাটগুলোতে ইজারা নিয়ে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি, রাজনৈতিক পরিচয় এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা—এই তিনটির সমন্বয় ছাড়া বড় হাটের ইজারা পাওয়া কঠিন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা দেখা গেলেও অন্তরালে থাকে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, কোরবানির হাটকে কেন্দ্র করে “চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট” সক্রিয় হয়ে ওঠে। হাটে প্রবেশ করা প্রতিটি গরুর গাড়ি, ট্রাক কিংবা অস্থায়ী দোকান থেকে বিভিন্ন অজুহাতে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি নির্ধারিত খাজনার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ঘটনাও নতুন নয়। তবে অধিকাংশ ব্যবসায়ী প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না, কারণ তারা পরবর্তীতে হয়রানির আশঙ্কা করেন।অর্থনীতিবিদদের মতে, পশুর হাট একটি বড় অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক খাত। ঈদকে কেন্দ্র করে কয়েক দিনের জন্য যে লেনদেন হয়, তা অনেক ছোট শিল্পখাতের বার্ষিক লেনদেনকেও ছাড়িয়ে যায়। এই বিপুল অর্থ প্রবাহের কারণে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর আগ্রহ বাড়ছে। অনেক সময় রাজনৈতিক দলের স্থানীয় ইউনিটগুলোও হাটকে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করে।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পশুর হাটকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, দখলবাজি, মামলা-পাল্টা মামলা এবং সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও ইজারা বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে, কোথাও আবার হাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়।
স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ইজারা কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করা হয়। তবে মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে অনেক সময় চাপের মুখে পড়তে হয়। একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বড় হাটগুলোর ইজারা নিয়ে “অদৃশ্য চাপ” কাজ করে।সুশাসন নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, পশুর হাট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে প্রতিবছর একই ধরনের অভিযোগ ও সংঘাত চলতেই থাকবে। তারা ডিজিটাল দরপত্র ব্যবস্থা, নির্ধারিত খাজনা তালিকা প্রকাশ, সিসিটিভি নজরদারি এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম জোরদারের সুপারিশ করেছেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ইজারা ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সাধারণ ক্রেতা ও বিক্রেতারাও চান নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ। তাদের অভিযোগ, হাটে অতিরিক্ত খাজনা ও অনিয়মের প্রভাব শেষ পর্যন্ত পশুর দামের ওপর পড়ে। ফলে সাধারণ ক্রেতাকে বাড়তি দাম গুনতে হয়। ব্যবসায়ীরাও নানা ধরনের অনানুষ্ঠানিক খরচ বহন করতে বাধ্য হন।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, গ্রামীণ ও মফস্বল অঞ্চলে অর্থনৈতিক শক্তিই অনেক সময় সামাজিক প্রভাবের ভিত্তি তৈরি করে। একটি বড় পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ স্থানীয়ভাবে “ক্ষমতার প্রতীক” হিসেবে কাজ করে। ফলে অনেকের কাছে এটি শুধু মৌসুমি ব্যবসা নয়; বরং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার একটি মাধ্যম।
তারা বলছেন, স্থানীয় পর্যায়ে যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পশুর হাট নিয়ন্ত্রণ করে, তারা প্রায়ই অন্যান্য ব্যবসা, পরিবহন, বাজার কমিটি কিংবা সামাজিক সংগঠনেও প্রভাব বিস্তার করে। এ কারণে হাটের ইজারা নিয়ে প্রতিযোগিতা অনেক সময় ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিরোধের রূপ নেয়।
বিশ্লেষকদের অভিমত, কোরবানির পশুর হাট বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী অর্থনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হলেও এর ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় সাধারণ ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে সংঘাত ও আধিপত্য রাজনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন