https://bindubanglatv.com/
স্টাফ রিপোর্টার : কুমিল্লার হোমনা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘সেরেস্তা ফি’ আদায় ও ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাংবাদিক আব্দুল হক এর ফেসবুক ওয়াল থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। দলিল লেখকদের অভিযোগ, এ খাতে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হলেও আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব তাঁদের জানানো হচ্ছে না। অন্যদিকে, অফিসের মসজিদের জন্য দলিলপ্রতি বরাদ্দ মাত্র ২০ টাকা। সংস্কারের অভাবে মসজিদের ছাদে ফাটল, খসে পড়েছে পলেস্তারা। বৃষ্টি হলে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে নামাজের স্থান ভিজে যায়। এতে দুর্ভোগে পড়ছেন মুসল্লিরা।
দলিল লেখকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হোমনা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সপ্তাহে তিন দিন দলিল নিবন্ধন হয়। প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৩৬০টি দলিল নিবন্ধন হলে চার সপ্তাহে এ সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৪৪০টি। এই হিসাবের ভিত্তিতে সেরেস্তা ফি বাবদ মাসে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায়ের সম্ভাবনা থাকলেও এর প্রকৃত আয়, ব্যয় ও উদ্বৃত্তের নিরীক্ষিত হিসাব পাওয়া যায়নি।
দলিলপ্রতি ৩ হাজার ২০০ টাকা আদায়ের অভিযোগ
দলিল লেখকদের অভিযোগ, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দলিলপ্রতি সেরেস্তা ফি ছিল ৩ হাজার ২০০ টাকা। মাসে ১ হাজার ৪৪০টি দলিল নিবন্ধনের হিসাব ধরে এ খাতে মাসিক আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৬ লাখ ৮ হাজার টাকা। একই হিসাবে বছরে সম্ভাব্য আদায় ৫ কোটি ৫২ লাখ ৯৬ হাজার টাকা।
দলিল লেখকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, অফিসের আনুষঙ্গিক খরচ, রসিদ লেখা, নকলনবিশদের নাশতা, মসজিদের অর্থসহ বিভিন্ন খাতে দলিলপ্রতি আনুমানিক ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকা ব্যয় হয়। সর্বোচ্চ ৯৫০ টাকা ব্যয় ধরে মাসিক খরচ দাঁড়ায় ১৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। সে হিসাবে সম্ভাব্য মাসিক উদ্বৃত্ত ৩২ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
তবে এসব হিসাব দলিলের সংখ্যা, ফি ও আনুমানিক ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃত আদায়, ব্যয়ের খাত, অর্থ গ্রহণকারীদের পরিচয় এবং হিসাবের নথি যাচাই ছাড়া এই অর্থকে নিট মুনাফা বা আত্মসাৎ করা অর্থ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।
ফি কমলেও হিসাব নিয়ে অসন্তোষ:
দলিল লেখকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শুক্কুরবার আলীকে সভাপতি ও শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি গঠনের পর সেরেস্তা ফি সর্বোচ্চ ১ হাজার ৮০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
দলিলপ্রতি এই হার এবং মাসে ১ হাজার ৪৪০টি দলিল নিবন্ধনের হিসাব ধরে মাসিক সম্ভাব্য আদায় দাঁড়ায় ২৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা। দলিলপ্রতি ৯৫০ টাকা ব্যয় ধরে মাসিক ব্যয় ১৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা এবং সম্ভাব্য উদ্বৃত্ত ১২ লাখ ২৪ হাজার টাকা। বছরে এ অঙ্ক দাঁড়ায় ১ কোটি ৪৬ লাখ ৮৮ হাজার টাকা।
বর্তমানে সাবেক সভাপতি মো. মিজানুর রহমানকে সভাপতি ও কবির হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক করে ৬১ সদস্যের নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। দলিল লেখকদের অভিযোগ, নতুন কমিটিও আগের নির্ধারিত ফি বহাল রেখেছে। ফলে অর্থ আদায় ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে তাঁদের প্রশ্ন রয়ে গেছে।
হিসাব চাইতে গিয়ে ছয়জন শোকজের মুখে?
দলিল লেখক সমিতির সাবেক সভাপতি শুক্কুর আলী মোক্তার অভিযোগ করেন, সেরেস্তার টাকা কোন কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব দেওয়া হচ্ছে না। হিসাব চাইতে গিয়ে ছয়জন দলিল লেখক শোকজের মুখে পড়েছেন এবং তাঁদের দলিল নিবন্ধনের কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।
শুক্কুর আলীর অভিযোগ, অফিসের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সমিতির নেতাদের মধ্যে সেরেস্তার অর্থ ভাগবাটোয়ারা করে আত্মসাৎ করা হচ্ছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নিরীক্ষা প্রতিবেদন, আর্থিক নথি কিংবা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে অভিযোগটির সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
মসজিদের জন্য বরাদ্দ মাত্র ২০ টাকা
সেরেস্তা ফি আদায় ও ব্যয় নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি অফিসের মসজিদের জরাজীর্ণ অবস্থাও আলোচনায় এসেছে। মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. শাহজাহান মোক্তার বলেন, “দলিলপ্রতি ২০ টাকা মসজিদের জন্য রাখা হয়। এ টাকা দিয়ে ইমামের বেতন ও বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়।”
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সীমিত অর্থের মধ্যেই মসজিদের প্রয়োজনীয় খরচ চালাতে হয়। অন্যদিকে, সরেজমিন পরিদর্শন ও সংস্কার ব্যয়ের নথি যাচাই করে মসজিদটির বর্তমান অবস্থা এবং প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা জরুরি।
দলিলপ্রতি ২০ টাকা হিসাবে মাসে ১ হাজার ৪৪০টি দলিল নিবন্ধন হলে মসজিদের জন্য সম্ভাব্য বরাদ্দ দাঁড়ায় ২৮ হাজার ৮০০ টাকা। বছরে তা ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬০০ টাকা। তবে প্রকৃত দলিলের সংখ্যা, অর্থ নিয়মিত জমা দেওয়া হয় কি না এবং মসজিদের তহবিলে কত টাকা জমা থাকে—এসব তথ্য হিসাবের খাতা ও রসিদ যাচাই ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
সভাপতির বক্তব্য, জানেন না সাব-রেজিস্ট্রার
দলিল লেখক সমিতির বর্তমান সভাপতি মো. মিজানুর রহমান বলেন, অফিসের খরচ ছাড়াও রসিদ লেখার টাকা, নকলনবিশদের নাশতা এবং বিভিন্ন দিবসের চাঁদা সেরেস্তার অর্থ থেকে ব্যয় করা হয়। ভবিষ্যতে মসজিদের জন্য দলিলপ্রতি ১০০ টাকা বরাদ্দের চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, হোমনা উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার মিলন কুমার শিউলী বলেন, অফিসের খরচের বাইরে অতিরিক্ত টাকা আদায় ও ব্যয়ের বিষয়ে দলিল লেখক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বলতে পারবেন। এ বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জেলা রেজিস্ট্রারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।