• রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ০৭:১৬ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

কর্পোরেট গণমাধ্যম: স্বাধীনতা, দায়বদ্ধতা ও বাস্তবতার প্রশ্ন

বিপ্লব সিকদার / ৪৯ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

গণমাধ্যম একটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। গণতন্ত্রের শ্বাস-প্রশ্বাস, মানুষের অধিকার, রাষ্ট্রের জবাবদিহি সবকিছুর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে এই খাতের। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে, বিশেষ করে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ক্রমেই সামনে চলে এসেছে কর্পোরেট হাউজের মালিকানাধীন গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন? তারা কি সত্যিই জনস্বার্থে কাজ করছে, নাকি কর্পোরেট স্বার্থের প্রতিফলন ঘটাচ্ছে?
প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, গণমাধ্যম এখন আর শুধু আদর্শ বা দায়বদ্ধতার জায়গায় দাঁড়িয়ে পরিচালিত হয় না; এটি একটি বড় শিল্পখাতেও পরিণত হয়েছে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন পোর্টাল—সবই এখন ব্যবসার অংশ। ফলে কর্পোরেট হাউজগুলোর বিনিয়োগ এখানে স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। এর ইতিবাচক দিকও আছে। কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতায় গণমাধ্যম আর্থিকভাবে শক্তিশালী হয়, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে, দক্ষ সাংবাদিক নিয়োগ দিতে পারে এবং আন্তর্জাতিক মানের কনটেন্ট তৈরি করতে সক্ষম হয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পরিচালনার জন্য যে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন, তা কর্পোরেট কাঠামো ছাড়া অনেক সময় সম্ভব হয় না।
কিন্তু এখানেই শুরু হয় দ্বন্দ্ব। কর্পোরেট মালিকানা যখন গণমাধ্যমের ওপর প্রভাব বিস্তার করে, তখন সংবাদ পরিবেশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। কারণ একটি কর্পোরেট হাউজের নিজস্ব ব্যবসায়িক স্বার্থ থাকে, রাজনৈতিক সংযোগ থাকে, এবং ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্ক থাকে। ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে কোনো সংবাদ প্রকাশ করা হবে কি হবে না—তা নির্ধারিত হয় কেবল জনস্বার্থে নয়, বরং মালিকানার স্বার্থ বিবেচনায়।
ধরা যাক, কোনো বড় শিল্পগোষ্ঠী একটি টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক। সেই শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যদি পরিবেশ দূষণ, শ্রমিক নির্যাতন বা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেই চ্যানেল কি নিরপেক্ষভাবে খবরটি প্রচার করতে পারবে? বাস্তবতা বলছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয় না। একইভাবে, বড় বিজ্ঞাপনদাতাদের বিরুদ্ধেও নেতিবাচক সংবাদ অনেক সময় চাপা পড়ে যায়। কারণ বিজ্ঞাপনই গণমাধ্যমের প্রধান আয়ের উৎস, আর এই অর্থনৈতিক নির্ভরতা অনেক সময় সংবাদকে প্রভাবিত করে।এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—স্বাধীনতা কখনোই পুরোপুরি পরম নয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সবসময়ই একটি আপেক্ষিক ধারণা। কিন্তু এই আপেক্ষিকতার মধ্যেও একটি গ্রহণযোগ্য সীমা থাকা প্রয়োজন। সেই সীমা নির্ধারণ করে দেয় নৈতিকতা, পেশাগত মানদণ্ড এবং জবাবদিহির কাঠামো।
একটি দায়িত্বশীল কর্পোরেট গণমাধ্যমের প্রথম কাজ হওয়া উচিত মালিকানা ও সম্পাদনার মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন তৈরি করা। অর্থাৎ, মালিক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করবে, কিন্তু সংবাদ কীভাবে পরিবেশিত হবে—সেই সিদ্ধান্ত নেবে সম্পাদনা বিভাগ। অনেক উন্নত দেশে এই মডেল কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হয়। সেখানে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি, যা সহজে লঙ্ঘন করা যায় না।
দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যমের নিজস্ব নীতিমালা থাকা জরুরি। কোন সংবাদ কীভাবে যাচাই করা হবে, স্বার্থের সংঘাত হলে কীভাবে তা প্রকাশ করা হবে, ভুল হলে কীভাবে সংশোধন করা হবে এসব বিষয় স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা দরকার। এতে করে পাঠক বা দর্শক বুঝতে পারে, একটি গণমাধ্যম কতটা দায়িত্বশীল।তৃতীয়ত, সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন সাংবাদিক যদি সত্য প্রকাশ করতে ভয় পান, যদি তাকে চাকরি হারানোর আতঙ্কে থাকতে হয়, তাহলে তিনি কখনোই নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবেন না। কর্পোরেট মালিকানার ভেতরেও এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব, যদি সত্যিকার অর্থে নীতির প্রতি অঙ্গীকার থাকে।তবে শুধু কর্পোরেট বা গণমাধ্যমকে দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এখানে রাষ্ট্র, সমাজ এবং নাগরিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকলে, তারা অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে—কোন সংবাদ বিশ্বাসযোগ্য, কোনটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা বোঝার ক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, গণমাধ্যমের সামাজিক দায়বদ্ধতা। কর্পোরেট মালিকানার বাইরে গিয়ে তাদের প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠ তুলে ধরতে হবে। গ্রামের কৃষক, শহরের শ্রমিক, বঞ্চিত জনগোষ্ঠী তাদের সমস্যাগুলো যদি গণমাধ্যমে জায়গা না পায়, তাহলে সেই গণমাধ্যম কেবল এলিট শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করবে। এটি গণমাধ্যমের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।অনেক সময় দেখা যায়, কর্পোরেট গণমাধ্যম রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বেও জড়িয়ে পড়ে। কোনো একটি নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে তারা সংবাদ পরিবেশন করে। এটি শুধু সাংবাদিকতার নৈতিকতা লঙ্ঘন করে না, বরং সমাজে বিভাজনও তৈরি করে। একটি গণমাধ্যমের উচিত সত্যের পক্ষে থাকা, কোনো দলের পক্ষে নয়।
ডিজিটাল যুগে এসে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসারের ফলে তথ্যের প্রবাহ বেড়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে ভুয়া সংবাদ ও অপপ্রচারও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে কর্পোরেট গণমাধ্যমের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। তাদের উচিত যাচাই-বাছাই করা তথ্য পরিবেশন করা, যাতে মানুষ সঠিক তথ্য পায় এবং বিভ্রান্ত না হয়।  কর্পোরেট হাউজের অধীনে থাকা গণমাধ্যমকে একপাক্ষিকভাবে দোষারোপ করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি অন্ধভাবে বিশ্বাস করাও সমীচীন নয়। এখানে একটি ভারসাম্য প্রয়োজন। কর্পোরেট শক্তি যদি নৈতিকতা, পেশাদারিত্ব এবং জনস্বার্থের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারে, তাহলে তারা একটি শক্তিশালী ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু যদি তারা কেবল মুনাফা ও প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে গণতন্ত্রের জন্য তা হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।গণমাধ্যমের মূল শক্তি তার বিশ্বাসযোগ্যতা। এই বিশ্বাসযোগ্যতা একবার হারিয়ে গেলে তা ফিরে পাওয়া খুব কঠিন। তাই কর্পোরেট হাউজগুলোর উচিত বুঝতে হবে গণমাধ্যম শুধু একটি ব্যবসা নয়, এটি একটি দায়িত্ব, একটি অঙ্গীকার। আর সেই অঙ্গীকারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে সত্য, ন্যায় এবং জনগণের স্বার্থ।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন