ঢাকা   ১১:৪১:০৫ পিএম, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রযুক্তি-দক্ষতা বাড়াতে হবে

Reporter Name
  • Update Time : Wednesday, October 28, 2026,
  • 5 Time View
  • ৯ মিনিট পড়ার সময়
  • ফন্ট:

বিপ্লব সিকদার : তথ্যপ্রযুক্তি আধুনিক সভ্যতার অন্যতম চালিকাশক্তি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও সরকারি সেবা—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু প্রযুক্তির এই অগ্রগতির সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। বিশেষ করে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের একটি বড় অংশ এখনো তথ্যপ্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে ডিজিটাল অগ্রযাত্রায় তাদের পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এই বৈষম্য কমাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রযুক্তি-দক্ষতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

শুধু স্মার্টফোন কিংবা ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করলেই ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন প্রযুক্তির কার্যকর, নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা। কীভাবে অনলাইনে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজতে হয়, সরকারি সেবা গ্রহণ করতে হয়, ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন করতে হয় কিংবা অনলাইন প্রতারণা থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে হয়—এসব বিষয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। একই সঙ্গে ভুয়া তথ্য শনাক্ত করা, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বশীল ব্যবহার সম্পর্কেও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

প্রান্তিক মানুষের প্রযুক্তি-দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভাষা, আর্থিক সামর্থ্য ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বড় বাধা। অনেকের কাছে স্মার্টফোন থাকলেও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ, পর্যাপ্ত ডিজিটাল জ্ঞান কিংবা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের সুযোগ নেই। কোথাও আবার বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন, সহজবোধ্য বাংলা ভাষায় শিক্ষাসামগ্রী তৈরি এবং স্বল্প ব্যয়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা ও প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি সেন্টার ও গ্রন্থাগারকে কাজে লাগিয়ে নিয়মিত ডিজিটাল সাক্ষরতা কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে। বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণদের উপযোগী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। প্রশিক্ষণ যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য অংশগ্রহণকারীদের বাস্তব দক্ষতা অর্জন ও প্রয়োগের অগ্রগতিও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একজন কৃষক আবহাওয়া, ফসলের রোগবালাই ও বাজারদর সম্পর্কে তথ্য পেতে পারেন। একজন শিক্ষার্থী অনলাইন শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করে জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে পারেন। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পণ্য বাজারজাত করে নতুন ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারেন। একইভাবে সাধারণ মানুষ ঘরে বসে বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ খুঁজে নিতে পারেন। তবে এসব সুবিধা বাস্তবে কাজে লাগাতে হলে প্রযুক্তি ব্যবহারের জ্ঞান ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে হবে।

প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, গুজব ও ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের ঝুঁকিও বাড়ছে। প্রযুক্তি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এসব ঝুঁকির সহজ শিকারে পরিণত হতে পারে। তাই ডিজিটাল সাক্ষরতার সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার শেখানোর পাশাপাশি এর অপব্যবহার থেকে সুরক্ষিত থাকার কৌশলও জানাতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রযুক্তি-দক্ষতা উন্নয়নকে এককালীন প্রকল্প হিসেবে দেখা যাবে না। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে সহায়তা এবং সহজলভ্য সেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রতিবন্ধকতা কোথায়, কোন জনগোষ্ঠীর কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন এবং প্রশিক্ষণের ফলে তাদের জীবনে কী পরিবর্তন আসছে—তা নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের যে প্রত্যাশা, তা বাস্তবায়নে কাউকে পিছনে ফেলে রাখা চলবে না। প্রযুক্তির সুবিধা কেবল শহর, শিক্ষিত কিংবা আর্থিকভাবে সচ্ছল মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সামগ্রিক উন্নয়ন টেকসই হবে না। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে তথ্যপ্রযুক্তির কার্যকর, নিরাপদ ও টেকসই ব্যবহার শেখাতে পারলে তাদের জন্য শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। তাই প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা গড়ে তোলাকেই উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম অগ্রাধিকার দিতে হবে।

লেখক -সাংবাদিক

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি