https://bindubanglatv.com/
কুমিল্লার মেঘনা—নদী, চর আর জেলেজীবনের সঙ্গে যার সম্পর্ক শত বছরের। বর্ষা এলেই নদীর বুক ফুলে ওঠে, ভেসে আসে নানা প্রজাতির মাছ। এই নদীই বহু পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস। কিন্তু সেই নদীর বুকেই বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে এক বিতর্কিত মাছ শিকারের পদ্ধতি—স্থানীয় ভাষায় যার নাম ‘ঝোপ’।
বাঁশ, গাছের ডালপালা, কচুরিপানা কিংবা বিভিন্ন ধরনের জলজ উদ্ভিদ নদীতে ফেলে নির্দিষ্ট জায়গা দখলে নিয়ে সেখানে জাল দিয়ে মাছ আটকে রাখা হয়। দূর থেকে দেখতে সাধারণ একটি মাছ ধরার ব্যবস্থা মনে হলেও এর আড়ালে তৈরি হয়েছে প্রভাবশালী একটি মাছ-বাণিজ্য। কে কোথায় ঝোপ দেবেন, কতটুকু নদী দখলে রাখবেন, কার নৌকা সেখানে ঢুকবে—এসব নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অলিখিত নিয়ন্ত্রণ।
কয়েক বছর আগে কুমিল্লার মেঘনা, তিতাসসহ বিভিন্ন নদী ও শাখা নদীতে ঝোপ দিয়ে মাছ শিকারের বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছিল। তখন স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ছিল, বড় একটি ঝোপ থেকে কয়েক লাখ টাকার মাছ শিকার ও বিক্রি করা হয়। ওই প্রতিবেদনে মৎস্য কর্মকর্তার বক্তব্যও ছিল—বহমান নদীতে ঘের, স্থায়ী বাঁধ বা এ ধরনের কাঠামো তৈরি করে মাছ ধরা আইনবিরুদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য।
অর্থাৎ এটি নিছক ‘ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরা’ নয়; নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও মাছের বিচরণক্ষেত্র আটকে দিয়ে মাছ আহরণের পদ্ধতি আইনগত প্রশ্নও তৈরি করে।
মেঘনার নদীপাড়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঝোপ ব্যবসায় জড়িতদের মধ্যে শুধু পেশাদার জেলে রয়েছেন—এমন নয়। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার থেকে শুরু করে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, এমনকি শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারের লোকজনের নামও স্থানীয় আলোচনায় আসে। তবে এসব অভিযোগের প্রত্যেকটির স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া না গেলে কাউকে নির্দিষ্টভাবে অভিযুক্ত করার সুযোগ নেই।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীতে যার প্রভাব যত বেশি, তার ঝোপের পরিমাণও তত বেশি। নদী যেন সবার হলেও নদীর নির্দিষ্ট অংশকে নিজেদের ‘এলাকা’ হিসেবে ব্যবহার করেন কেউ কেউ। ফলে সাধারণ জেলে সেখানে মাছ ধরতে গেলে নানা বাধার মুখে পড়েন।
একজন সাধারণ জেলের কাছে নদী মানে জীবিকার জায়গা। কিন্তু প্রভাবশালীর কাছে নদীর নির্দিষ্ট অংশ হয়ে উঠছে বিনিয়োগের ক্ষেত্র। বাঁশ, জাল, শ্রমিক ও নৌযানে বিনিয়োগ করে তৈরি করা হয় ঝোপ। এরপর সেখানে আটকে থাকা মাছ নিয়মিত তুলে বাজারে বিক্রি করা হয়। মাছের পরিমাণ ও বাজারদর ভালো হলে একেকটি ঝোপ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ আসে।
এই ব্যবসার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—এখানে শুধু বড় মাছ আটকে থাকে না। ঝোপের আশপাশে মাছের বিচরণ ও চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে ছোট মাছ, পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণীও জালে আটকা পড়ে। ফলে আজকের লাভের জন্য আগামী দিনের মাছের ভাণ্ডার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বাংলাদেশের প্রচলিত মৎস্য আইনে সরকারকে নির্দিষ্ট জলাশয়ে মাছ ধরার পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ, স্থায়ী বা অস্থায়ী বিভিন্ন কাঠামো নিয়ন্ত্রণ এবং নির্দিষ্ট ধরনের জাল, ফাঁদ বা মাছ ধরার সরঞ্জাম নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের বর্তমান আইনভান্ডারেও মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ বিধিমালা এবং সংশ্লিষ্ট আইন রয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—আইন থাকলেও নদীর বুকজুড়ে ঝোপ কীভাবে টিকে থাকে?
স্থানীয়দের অভিযোগের আঙুল যায় তদারকি ব্যবস্থার দিকে। তাদের দাবি, নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান থাকলে নদীতে দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের স্থাপনা টিকে থাকা কঠিন। কিন্তু বাস্তবে নদীর প্রত্যন্ত চর, শাখা নদী ও দুর্গম অংশে নিয়মিত নজরদারি না থাকায় ঝোপ স্থাপনকারীরা সুযোগ পেয়ে যান।
আর এখানেই উঠছে আরও গুরুতর অভিযোগ—কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তি নাকি সরাসরি না হলেও নীরব সমর্থনের মাধ্যমে এ ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখছেন। কোথাও কোথাও সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ ও প্রশাসনিক নথি ছাড়া তা সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
কারণ নদীতে একটি ঝোপ রাতারাতি তৈরি হয় না। বাঁশ আসে, শ্রমিক আসে, জাল আসে, নৌকা লাগে, মাছ তোলার লোক থাকে এবং পরে সেই মাছ বাজারজাত হয়। এতগুলো ধাপ পেরিয়ে একটি বড় ব্যবসা পরিচালিত হওয়ার পরও যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা দেখতে না পায়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—নজরদারির ঘাটতি কোথায়?
নৌ পুলিশের ভূমিকা নিয়েও স্থানীয়দের প্রশ্ন রয়েছে। নদীর বুকের ওপর দৃশ্যমানভাবে বাঁশ-জাল দিয়ে বড় একটি অংশ ঘিরে রাখা হলে সেটি সাধারণ মানুষের চোখে পড়লেও নিয়মিত টহলদারি সংস্থার চোখে পড়ে না কেন—এ প্রশ্নের উত্তর দরকার। ‘ফকফকা আলোতেও চোখে দেখে না’—স্থানীয়দের এমন ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য আসলে দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
তবে সব দায় নৌ পুলিশের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগও নেই। মৎস্য অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসন, নৌ পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত দায়িত্ব রয়েছে। কে নদীর কোন অংশে কীভাবে মাছ ধরছে, কোথায় নিষিদ্ধ কাঠামো তৈরি হয়েছে, কোন জাল ব্যবহৃত হচ্ছে—এসব বিষয়ে সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—নদী কি কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি?
নদী সবার। কিন্তু ঝোপের মাধ্যমে নদীর একটি অংশ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে রাখার ফলে বাস্তবে সেটি ব্যক্তিগত মাছের খামারের মতো ব্যবহৃত হচ্ছে। সাধারণ জেলে সেখানে স্বাধীনভাবে মাছ ধরতে পারেন না। ফলে নদীর সম্পদে সবার অধিকার থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে প্রভাবশালীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
এখানেই তৈরি হয় ‘ক্ষমতার যত বেশি, নদী তত বেশি’—এমন এক বাস্তবতা।
মেঘনার নদীপাড়ের মানুষের অভিযোগ, ঝোপের ব্যবসায় স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবশালীদের সংশ্লিষ্টতা থাকলে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে ভয় পান। কেউ প্রতিবাদ করলে সম্পর্ক নষ্ট, সামাজিক চাপ কিংবা নানা ধরনের হয়রানির আশঙ্কা থাকে। ফলে নদীর ওপর অন্যায় দখল দেখেও অনেকে চুপ থাকেন।
এই নীরবতাই ঝোপ ব্যবসার সবচেয়ে বড় শক্তি।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মৎস্যসম্পদ রক্ষা ও সংরক্ষণের জন্য আইন ও বিধিমালা কার্যকর রয়েছে। আবার সাম্প্রতিক সময়েও মেঘনা নদীর বিভিন্ন অংশে নিষিদ্ধ উপায়ে মাছ ধরার বিরুদ্ধে অভিযান ও জরিমানার খবর পাওয়া গেছে। অর্থাৎ নদীতে অবৈধ মাছ শিকার বন্ধ করার নজির আছে; প্রয়োজন ধারাবাহিকতা ও নিরপেক্ষতা।
মেঘনার ঝোপ ব্যবসার অর্থনীতিও খতিয়ে দেখা দরকার। একটি ঝোপ তৈরিতে কত টাকা খরচ হয়, বছরে কত মাছ ওঠে, মাছ কোথায় বিক্রি হয়, কারা পাইকার হিসেবে কাজ করে, মাছ পরিবহনে কোন নৌযান ব্যবহৃত হয় এবং এসব লেনদেনের অর্থ কোথায় যায়—এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে পারলেই বোঝা যাবে এটি কত বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
এখানে আরও একটি বিষয় তদন্তের দাবি রাখে—নদীর কোন কোন অংশে নিয়মিত ঝোপ দেওয়া হয়, সেখানে কারা নিয়ন্ত্রণ করে এবং একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বছরের পর বছর কীভাবে একই জায়গা ব্যবহার করে। প্রয়োজনে নৌপথের স্যাটেলাইট ছবি, স্থানীয় নৌযান চলাচলের তথ্য, অভিযানসংক্রান্ত নথি, মৎস্য অফিসের রেকর্ড এবং স্থানীয় বাজারের মাছের বেচাকেনার তথ্য মিলিয়ে দেখা যেতে পারে।
কারণ শুধু নদীতে গিয়ে ঝোপ গুনলেই পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। ঝোপের পেছনে রয়েছে একটি সরবরাহব্যবস্থা, একটি শ্রমবাজার এবং একটি মাছের বাজার।
সবচেয়ে বড় কথা, মেঘনার নদী শুধু আজকের মাছের জন্য নয়। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র এবং সাধারণ জেলেদের জীবিকার সঙ্গে এর ভবিষ্যৎ জড়িত। নির্বিচারে নদীর জায়গা ঘিরে মাছ আহরণ চলতে থাকলে একসময় নদী হয়তো থাকবে, কিন্তু মাছ কমে যাবে; থাকবে পানি, থাকবে চর—কিন্তু নদীনির্ভর মানুষের জীবিকা সংকুচিত হবে।
তাই ‘ঝোপ’কে শুধু স্থানীয় ঐতিহ্য হিসেবে দেখার সময় শেষ। যে ঐতিহ্য নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে, ছোট মাছ ও পোনা ধ্বংস করে, সাধারণ জেলেদের অধিকার সংকুচিত করে এবং প্রভাবশালীদের নদীর অংশবিশেষ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়—সেটি সংরক্ষণের নয়, বরং যাচাই ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়।
মেঘনার নদীতে এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ জরিপ। কতটি ঝোপ আছে, কারা চালায়, কতটুকু নদীজুড়ে রয়েছে, কী ধরনের জাল ব্যবহৃত হচ্ছে, কত মাছ আহরণ হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অভিযান কতবার হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ্যে আসা দরকার।
প্রশ্ন শুধু মাছের নয়। প্রশ্ন নদীর মালিকানা, সাধারণ জেলের অধিকার এবং প্রশাসনের দায়িত্ববোধের।
মেঘনার বুক কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। নদীর মাছও কারও একার সম্পদ নয়। অথচ যদি ক্ষমতার জোরে নদীর একটি অংশ দখলে নিয়ে সেখানে বছরের পর বছর মাছের ব্যবসা চলে, তাহলে সেটি আর সাধারণ মাছ ধরা থাকে না—তা হয়ে ওঠে নদীকে ঘিরে এক অদৃশ্য অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য।
আর সেই সাম্রাজ্যের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নদী পাহারার দায়িত্বে থাকা চোখগুলো আসলে কতটা খোলা?