ঢাকা   ০৪:০২:৩১ এএম, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কৃষি জমি ভরাট করা মেঘনাবাসীর বাণিজ্য, লাভের ভাগ যায় শর্ষের গোলায়ও

Reporter Name
  • Update Time : Tuesday, August 18, 2026,
  • 66 Time View
  • ১০ মিনিট পড়ার সময়
  • ফন্ট:

মেঘনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি:

কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় কৃষিজমি ভরাট করে বসতবাড়ি, দোকানপাট ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। একসময় যে জমিতে ধান, সবজি ও অন্যান্য ফসল ফলত, সেই জমিতে এখন চলছে মাটি ফেলার প্রতিযোগিতা। কৃষিজমি ভরাটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে স্থানীয়ভাবে একটি লাভজনক বাণিজ্য। মাটি সরবরাহ, পরিবহন, জমি ভরাট—প্রতিটি ধাপেই লেনদেন হচ্ছে বিপুল অর্থের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কৃষিজমি ভরাটের এ কর্মকাণ্ড অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্যেই চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি ও ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না। কোথাও কোথাও প্রশাসনের অভিযান শুরু হলে কয়েকদিন কাজ বন্ধ থাকে, পরে আবার আগের মতোই মাটি ফেলার কাজ শুরু হয়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—কৃষিজমি রক্ষার দায়িত্ব যাদের, তাদের চোখের সামনেই কীভাবে চলছে এই বাণিজ্য?

মেঘনার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামাঞ্চলে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, নিচু কৃষিজমিতে ট্রাক, ট্রাক্টর ও অন্যান্য যানবাহনে করে মাটি এনে ফেলা হচ্ছে। জমির মালিকরা অনেক সময় ভবিষ্যতে বাড়ি নির্মাণ কিংবা জমির মূল্য বাড়ার আশায় কৃষিজমি ভরাট করছেন। আবার কেউ কেউ জমি ভরাট করে প্লট আকারে বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, একটি জমি ভরাটের সঙ্গে শুধু জমির মালিক নন—মাটি ব্যবসায়ী, পরিবহন মালিক, শ্রমিক, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যস্থতাকারীরাও যুক্ত থাকেন। ফলে কৃষিজমি ভরাট এখন অনেকের জন্য আয়ের একটি বড় উৎস হয়ে উঠেছে।

ফসলি জমি হারিয়ে বাড়ছে স্থাপনা

মেঘনার গ্রামাঞ্চলে জনবসতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বসতভিটার চাহিদাও বেড়েছে। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে কৃষিজমি ভরাটের কারণে কৃষি উৎপাদনের জমি ক্রমেই কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে নিচু জমি ও জলাধার ভরাটের ফলে বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনেও সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কৃষকেরা বলছেন, একটি জমি ভরাট করার পর সেটি আর সহজে কৃষিকাজে ফেরানো যায় না। দীর্ঘদিনের কৃষিজমি হারিয়ে গেলে শুধু একজন জমির মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হন না; এর প্রভাব পড়ে খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশ ও স্থানীয় জলাবদ্ধতার ওপরও।

একাধিক কৃষকের অভিযোগ, জমি ভরাটের কারণে আশপাশের জমিতে পানি জমে থাকে। ফলে অনেক সময় আবাদ ব্যাহত হয়। কোথাও আবার খাল, নালা কিংবা প্রাকৃতিক পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

‘শর্ষের মধ্যে ভূত’—অভিযোগ নজরদারির দুর্বলতার

কৃষিজমি রক্ষায় সরকারি বিধিনিষেধ থাকলেও তা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে—এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, জমি ভরাটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা প্রশাসনিক নজরদারি এড়িয়ে চলতে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করেন। কোথাও অভিযোগ ওঠে, স্থানীয় পর্যায়ে বিষয়টি জানাজানি হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেরি হয়।

এমনকি স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, এই বাণিজ্য থেকে সুবিধাভোগীদের একটি অংশ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। ফলে কৃষিজমি ভরাট বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার বদলে অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টি ‘দেখেও না দেখার’ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া জরুরি। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী করার সুযোগ নেই। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তদন্তেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

মাটি আসে কোথা থেকে?

কৃষিজমি ভরাটের পাশাপাশি মাটির উৎস নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। স্থানীয়দের ভাষ্য, এক জায়গার নিচু জমি ভরাট করতে অন্য জায়গা থেকে মাটি কেটে আনা হচ্ছে। এতে কোথাও কৃষিজমি থেকে মাটি কাটার অভিযোগ উঠছে, কোথাও আবার নদী, খাল বা অন্যান্য উৎস থেকে মাটি সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে।

একজন স্থানীয় কৃষক বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনে জমিতে মাটি ফেলা হচ্ছে। আমরা প্রতিবাদ করলে বলা হয়, জমির মালিক নিজেই মাটি ফেলছেন। কিন্তু এতে আশপাশের জমির ক্ষতি হলে তার দায় কে নেবে?’

বাড়ছে জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনাহীনভাবে নিচু জমি ভরাট করলে স্থানীয় পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হতে পারে। এতে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কৃষিজমি কমে গেলে স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে।

মেঘনার মতো নদী ও খালবেষ্টিত এলাকায় জলাধার ও নিচু জমির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এসব জায়গা নির্বিচারে ভরাট করা হলে প্রাকৃতিক পানি ধারণক্ষমতা কমে যেতে পারে। ফলে অতিবৃষ্টি কিংবা উজান থেকে পানি নামলে দ্রুত পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তদন্ত ও নজরদারি জরুরি

স্থানীয়দের দাবি, মেঘনা উপজেলার কোথায় কোথায় কৃষিজমি ভরাট হচ্ছে, কারা ভরাট করছে, মাটি কোথা থেকে আসছে এবং এসব জমির ব্যবহার পরিবর্তনের অনুমোদন রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে প্রশাসনের সমন্বিত জরিপ করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে কৃষিজমি, জলাধার, খাল ও পানি চলাচলের পথ চিহ্নিত করে সেগুলো রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগ রয়েছে, কৃষিজমি ভরাটের ব্যবসায় লাভের ভাগ শুধু জমির মালিক কিংবা মাটি ব্যবসায়ীর ঘরে সীমাবদ্ধ থাকে না; স্থানীয় প্রভাবশালী ও দায়িত্বশীল মহলের কারও কারও নীরব সমর্থন বা সুবিধাভোগের অভিযোগও রয়েছে—যে কারণে স্থানীয়দের ভাষায়, ‘শর্ষের মধ্যেই ভূত’ খুঁজে বের করা জরুরি।

তবে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক তদন্ত, নথিপত্র যাচাই এবং সরেজমিন অনুসন্ধান প্রয়োজন। কৃষিজমি রক্ষার পাশাপাশি মাটি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত পুরো চক্রকে চিহ্নিত করা না গেলে বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে এ বাণিজ্য বন্ধ করা কঠিন হবে।

মেঘনার কৃষিজমি শুধু জমির মালিকের সম্পদ নয়—এটি স্থানীয় খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। তাই উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত কৃষিজমি ভরাট বন্ধে এখনই কার্যকর ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি