https://bindubanglatv.com/
একটি রাষ্ট্রের সাফল্য কেবল সরকার পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে সেই সরকার কত দ্রুত সঠিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারে এবং তা বাস্তবায়নে কতটা দক্ষতা দেখাতে পারে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের সামনে যে অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলো এখন দেশবাসীর নিবিড় পর্যবেক্ষণের বিষয়।সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইন-শৃঙ্খলা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও উঠে এসেছে যে নতুন সরকারের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং প্রশাসনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দীর্ঘদিন ধরেই কঠিন হয়ে উঠেছে। তাই বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফলতা অর্জিত হলে তার সুফল সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হবে।
একই সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নও অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম পূর্বশর্ত। বিনিয়োগকারীরা এমন পরিবেশে বিনিয়োগ করতে চান, যেখানে নিরাপত্তা, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত থাকে। সরকারও অর্থনীতি ও সুশাসনকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যেই সরকার মালয়েশিয়া ও চীন সফরে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিল্প খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা গড়ে উঠছে।
শুধু বিনিয়োগ নয়, রপ্তানি বহুমুখীকরণও সময়ের দাবি। দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকের ওপর অতিনির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন বাজারে কৃষিপণ্য, ওষুধ, চামড়া, মৎস্যসম্পদসহ অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
প্রবাসী কর্মসংস্থান বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করা, স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগ ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং আইনি প্রক্রিয়া জোরদারের উদ্যোগ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে আইনের শাসন, স্বচ্ছতা এবং যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশের বাস্তবতা বিশ্ববাসীর কাছে সুপরিচিত। নদী খনন, বৃক্ষরোপণ এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের দাবিতে সরকারের সক্রিয় অবস্থান দেশের দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত।
নতুন বাজেটে সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি, ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং রাজস্ব সংস্কারের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দক্ষতা, রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা এবং ব্যয়ের স্বচ্ছতার ওপর।
একটি সরকারের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় প্রতিশ্রুতিতে নয়, বাস্তব ফলাফলে। জনগণ দেখতে চায়—বাজারে স্বস্তি ফিরছে কি না, কর্মসংস্থান বাড়ছে কি না, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে কি না, দুর্নীতি কমছে কি না এবং প্রশাসনে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে কি না। এসব সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারলে বাংলাদেশ দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে এগিয়ে যেতে পারে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে জনগণের আস্থা। সেই আস্থা অর্জনের একমাত্র উপায় হলো স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। বর্তমান সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সুশাসনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে ধারাবাহিক সংস্কার, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।
লেখক -সাংবাদিক।