ঢাকা   ০২:৩৯:৪১ পিএম, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ত্রিশালের হারবা বিলে হাওরের স্বাদ, বিল-নদীতে দীর্ঘ নৌভ্রমণের হাতছানি

Reporter Name
  • Update Time : Sunday, August 2, 2026,
  • 75 Time View
  • ৮ মিনিট পড়ার সময়
  • ফন্ট:

এম.এ.এইচ. রাকিবুল ইসলাম:

বর্ষা এলেই ময়মনসিংহের ত্রিশালের হারবা বিল যেন ধারণ করে এক ভিন্ন রূপ। বিস্তীর্ণ জলরাশি, পানির মাঝে জেগে থাকা সবুজ গাছপালা, নৌকার ছুটে চলা, বিলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা হিজল গাছ, জলবেষ্টিত মসজিদ আর অস্তগামী সূর্যের অপরূপ দৃশ্য—সব মিলিয়ে হারবা বিল হয়ে ওঠে প্রকৃতির এক অনন্য লীলাভূমি। এখানে এলে অল্প সময়ের জন্য হলেও ভ্রমণপিপাসুদের মনে হয়, যেন চলে এসেছেন কোনো এক বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে। উপভোগ করা যায় হাওরের স্বাদ ও আবহ।

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার সাইনবোর্ড বাজার থেকে কাশিগঞ্জ বাজারের পথে, কাশিগঞ্জ বাজার থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে এই মনোরম হারবা বিলের অবস্থান। বর্ষা মৌসুমে বিলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে একাকার হয়ে গেলে চারপাশে তৈরি হয় এক অপূর্ব নৈসর্গিক পরিবেশ। বিলের জলরাশি একপর্যায়ে এসে খিরু নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। আর এই সংযোগের কারণে ভ্রমণপিপাসুরা চাইলে একই নৌভ্রমণে হারবা বিলের বিস্তীর্ণ জলরাশি পেরিয়ে খিরু নদীতেও ঘুরে বেড়াতে পারেন। অর্থাৎ, একসঙ্গে বিল ও নদীর দীর্ঘ নৌভ্রমণের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে এখানে। নৌকা নিয়ে বিল থেকে নদীতে প্রবেশের সময় বদলে যেতে থাকে চারপাশের দৃশ্যপট; একদিকে বিলের বিস্তীর্ণ জলরাশি, অন্যদিকে নদীর প্রবাহ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় দীর্ঘ ও উপভোগ্য এক নৌভ্রমণের অভিজ্ঞতা।

হারবা বিলের প্রধান আকর্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম বিলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটি হিজল গাছ। বিস্তীর্ণ জলরাশির মধ্যে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা হিজল গাছটি যেন হারবা বিলের সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ভ্রমণপিপাসু মানুষ ছোট ছোট নৌকা নিয়ে ছুটে যান সেই হিজল গাছের কাছে। নৌকা নিয়ে গাছটির চারপাশে ঘুরে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেন তাঁরা। অনেকের কাছেই হারবা বিল ভ্রমণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় মুহূর্ত হলো নৌকায় করে সেই হিজল গাছের কাছে পৌঁছানো।

হারবা বিল ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ নৌভ্রমণ। দর্শনার্থীদের জন্য ছোট ছোট নৌকা অল্প খরচেই ভাড়া পাওয়া যায়। নৌকায় চড়ে বিস্তীর্ণ বিলের পানিতে ঘুরে বেড়ানোর সময় চারপাশের প্রকৃতি যেন আরও কাছে ধরা দেয়। নৌকার বৈঠার ছন্দে পানির ঢেউ কেটে এগিয়ে চলা, খোলা আকাশের নিচে চারপাশের বিশাল জলরাশি আর নির্মল বাতাস—সব মিলিয়ে তৈরি হয় হাওরের মতো এক মনোরম পরিবেশ। আর বিলের সঙ্গে খিরু নদীর সংযোগ থাকায় নৌকায় দীর্ঘ সময় ধরে ঘোরার সুযোগও রয়েছে।

বিলের জলরাশির মধ্যে ও আশপাশের দৃশ্যপটে থাকা স্থাপনাগুলোও হারবা বিলের সৌন্দর্যে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। বিশেষ করে জলরাশির মাঝে থাকা মসজিদের গম্বুজ ও মিনার দূর থেকেই দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। চারপাশের পানি ও সবুজ প্রকৃতির মধ্যে মসজিদটির অবস্থান পুরো দৃশ্যকে করে তুলেছে আরও নান্দনিক। অন্যদিকে, বিলের এক পাশে রয়েছে ইটভাটা। বিস্তীর্ণ জলরাশির পাশে সারি সারি লাল ইটের স্তূপ প্রকৃতির দৃশ্যের সঙ্গে তৈরি করেছে এক ভিন্ন বৈচিত্র্য।

বিকেল নামার সঙ্গে সঙ্গে হারবা বিলের সৌন্দর্য যেন আরও বাড়তে থাকে। পশ্চিম আকাশে সূর্য যখন অস্ত যেতে শুরু করে, তখন তার সোনালি-লাল আভা ছড়িয়ে পড়ে বিলের শান্ত পানিতে। পানির ওপর সূর্যের প্রতিচ্ছবি, দূরে গাছের সারি আর নৌকার চলাচল—সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয় মনোমুগ্ধকর এক দৃশ্য। নৌকায় বসে বিল থেকে খিরু নদীর দিকে এগিয়ে যেতে যেতে সূর্যাস্ত উপভোগ করার অভিজ্ঞতা ভ্রমণকারীদের জন্য হয়ে ওঠে আরও স্মরণীয়।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হারবা বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভ্রমণপিপাসু মানুষ এখানে আসেন। বিশেষ করে বর্ষাকালে বিস্তীর্ণ জলরাশি, খিরু নদীর সঙ্গে বিলের সংযোগ, দীর্ঘ নৌভ্রমণ এবং বিলের মাঝখানের হিজল গাছ দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হারবা বিলের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় দিন দিন এর পরিচিতিও বাড়ছে।

স্থানীয়রা মনে করেন, পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে হারবা বিলকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে সম্ভাবনাময় একটি পর্যটনকেন্দ্র। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নৌভ্রমণকে সুশৃঙ্খল করা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা গেলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আরও বেশি পর্যটক এখানে আসবেন। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বর্ষার বিস্তীর্ণ জলরাশি, খিরু নদীর সঙ্গে মিলন, হাওরের স্বাদ, বিল থেকে নদীতে দীর্ঘ নৌভ্রমণের সুযোগ, বিলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা হিজল গাছ, পানিবেষ্টিত মসজিদের সৌন্দর্য, ইটভাটার বৈচিত্র্যময় দৃশ্য এবং সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর রূপ—সব মিলিয়ে ত্রিশালের হারবা বিল হতে পারে প্রকৃতির সান্নিধ্যে হারিয়ে যাওয়ার এক অনন্য ঠিকানা।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি