ঢাকা   ০৫:০৯:২৪ এএম, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অবৈধ বালুভরাটে মেঘনার প্রকৃতি কৃষি অস্তিত্ব আজ সংকটে

আল মামুন, মেঘনা উপজেলা প্রতিনিধি
  • Update Time : Friday, August 7, 2026,
  • 89 Time View
  • ৬ মিনিট পড়ার সময়
  • ফন্ট:

কুমিল্লার মেঘনা উপজেলা একসময় ছিল নদী, খাল-বিল, সবুজ ফসলের মাঠ ও জীববৈচিত্র্যের এক অপূর্ব জনপদ। বর্ষার পানিতে ভরে উঠত নিম্নাঞ্চল, কৃষকের জমিতে ফলত সোনালি ধান, আর নদী ও জলাশয় ছিল হাজারো মানুষের জীবিকার উৎস। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। অপরিকল্পিত বালু ভরাট, অবৈধ ড্রেজিং এবং জলাশয় দখলের অভিযোগে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে মেঘনার প্রাকৃতিক পরিবেশ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি, খাল, বিল ও নিচু জমিতে নির্বিচারে বালু ফেলা হচ্ছে। কোথাও আবাসন, কোথাও শিল্প কিংবা ব্যক্তিগত প্রকল্পের নামে ভরাট করা হচ্ছে বিস্তীর্ণ এলাকা। এর ফলে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা বাড়ছে এবং কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে।
কৃষকদের ভাষ্য, একসময় যে জমিতে বছরে দুই থেকে তিনটি ফসল হতো, সেখানে এখন বালুর স্তূপ। অনেক জমি বছরের পর বছর অনাবাদি হয়ে পড়েছে। ফলে কৃষকের আয় কমেছে, বেড়েছে উৎপাদন ব্যয় এবং খাদ্য নিরাপত্তাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
শুধু কৃষিই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশও। জলাভূমি ভরাট হওয়ায় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ, জলজ উদ্ভিদ ও নানা বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। পরিবেশবিদদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে মেঘনার প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, নিবন্ধনহীন বা বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা কিছু আনলোড ড্রেজার দীর্ঘদিন ধরে বালু পরিবহন ও ভরাটের কাজে ব্যবহৃত হলেও অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা দেখা যায় না। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এসব কার্যক্রম কীভাবে অব্যাহত রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর নজরদারি কতটা কার্যকর?
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি মহলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবের কারণে অনেক সময় অভিযোগের পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য নেওয়া এবং প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাভূমি ও কৃষিজমি অপরিকল্পিতভাবে ভরাট করলে শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এর বিরূপ প্রভাব বহন করবে। ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ কমে যাবে, আকস্মিক জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়বে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।মেঘনার মানুষ এখন উন্নয়নের বিরোধিতা করছেন না; তারা চান পরিকল্পিত উন্নয়ন। এমন উন্নয়ন, যেখানে কৃষিজমি রক্ষা পাবে, নদী-খাল বেঁচে থাকবে, পরিবেশের ভারসাম্য অটুট থাকবে এবং আইনের শাসন নিশ্চিত হবে।
মেঘনার নদী, খাল ও ফসলি জমি কেবল ভূমির অংশ নয়—এগুলো এই জনপদের ইতিহাস, অর্থনীতি এবং মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই উন্নয়নের নামে যদি প্রকৃতিই হারিয়ে যায়, তবে সেই উন্নয়নের সুফল কতটা টেকসই হবে—এই প্রশ্ন আজ মেঘনার প্রতিটি সচেতন মানুষের।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি