ঢাকা   ০৪:৫৮:৩০ এএম, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খণ্ডকালীন শিক্ষকদের জন্য সুস্পষ্ট ও ন্যায্য বেতন কাঠামো না থাকায় শিক্ষা ব্যাহত

বিপ্লব সিকদার
  • Update Time : Friday, February 27, 2026,
  • 473 Time View
  • ১০ মিনিট পড়ার সময়
  • ফন্ট:

খণ্ডকালীন শিক্ষকদের জন্য সুস্পষ্ট ও ন্যায্য বেতন কাঠামো না থাকা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি দীর্ঘদিনের অবহেলিত বাস্তবতা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের অবদান অপরিসীম হলেও আর্থিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে তারা পেশাগত স্থিতি ও মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না। ফলে একদিকে যেমন শিক্ষকের ব্যক্তিগত জীবন চাপে পড়ে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীর শেখার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত সংকট নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক মান ও জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।খণ্ডকালীন শিক্ষকরা সাধারণত ক্লাসভিত্তিক পারিশ্রমিক পান, যা অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রতুল এবং অনিয়মিত। মাস শেষে নিশ্চিত আয় না থাকায় তাদের জীবিকা নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়ে। ভাড়া, চিকিৎসা, পারিবারিক ব্যয় কিংবা সন্তানের শিক্ষার খরচ—এসব মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে তারা বাধ্য হন অতিরিক্ত আয়ের পথ খুঁজতে। টিউশনি, কোচিং, অনলাইন ক্লাস কিংবা অন্য পেশায় সময় দেওয়া তখন আর পছন্দের বিষয় থাকে না; হয়ে ওঠে টিকে থাকার লড়াই। এই বাস্তবতা শিক্ষকের সময় ও শক্তিকে বিভক্ত করে দেয়, যা সরাসরি শ্রেণিকক্ষে প্রভাব ফেলে।শিক্ষকতা এমন একটি পেশা যেখানে মানসিক প্রস্তুতি, পাঠ পরিকল্পনা, শিক্ষার্থীর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং মূল্যায়নের জন্য সময় দরকার। খণ্ডকালীন শিক্ষক যদি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় ক্লাস নেন বা কোচিং করান, তাহলে মূল প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় ক্লাসে উপস্থিত থাকলেও মানসিকভাবে ক্লান্ত থাকেন, ফলে পাঠদানের গুণগত মান কমে যায়। শিক্ষার্থীরা তখন কেবল সিলেবাস শেষ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে; গভীর বোঝাপড়া বা সৃজনশীল চিন্তার সুযোগ পায় না।
এর আরেকটি সূক্ষ্ম প্রভাব হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে দ্বৈত মানসিকতা তৈরি হওয়া। স্থায়ী শিক্ষক ও খণ্ডকালীন শিক্ষকের মধ্যে বেতন ও সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য থাকলে কর্মপরিবেশে অস্বস্তি জন্ম নেয়। খণ্ডকালীন শিক্ষকরা নিজেদের প্রান্তিক মনে করতে পারেন, যা তাদের আত্মসম্মান ও পেশাগত দায়বদ্ধতায় প্রভাব ফেলে। দীর্ঘমেয়াদে এতে দক্ষ ও প্রতিশ্রুতিশীল ব্যক্তিরা এই পেশা থেকে সরে যেতে পারেন। তখন প্রতিষ্ঠানকে বারবার নতুন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হয়, যা ধারাবাহিক শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে বিঘ্ন ঘটায়।শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও এর বহুমাত্রিক প্রভাব পড়ে। একজন শিক্ষক যদি প্রতিষ্ঠানের বাইরে বেশি সময় ব্যয় করেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তার একাডেমিক ও মানসিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা কঠিন হয়। শিক্ষার্থীরা কেবল ক্লাসরুমের সীমাবদ্ধ যোগাযোগ পায়; পরামর্শ, সহায়ক আলোচনা বা ব্যক্তিগত দিকনির্দেশনার সুযোগ কমে যায়। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা বা কলেজ পর্যায়ে, যেখানে গবেষণা, প্রজেক্ট ও বিশ্লেষণধর্মী কাজ গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে শিক্ষকের নিবিড় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। খণ্ডকালীন শিক্ষক যদি আর্থিক চাপে ব্যস্ত থাকেন, তবে এই অতিরিক্ত একাডেমিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয় না।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুনামও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলাফল খারাপ হলে বা শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত মান অর্জন করতে না পারলে দায় শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের ওপরই পড়ে। অথচ সমস্যার মূল কারণ অনেক সময় কাঠামোগত—যেখানে শিক্ষককে ন্যায্য পারিশ্রমিক ও স্থিতিশীলতা দেওয়া হয়নি। উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে মানবসম্পদে বিনিয়োগ অপরিহার্য। শিক্ষককে কেবল অস্থায়ী শ্রমশক্তি হিসেবে বিবেচনা করলে সেই বিনিয়োগের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যায়।
এখানে নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খণ্ডকালীন শিক্ষকদের জন্য একটি স্বচ্ছ ও মানসম্মত বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা দরকার, যাতে তাদের আয় অন্তত ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে সক্ষম হয়। কাজের ঘণ্টা, দায়িত্ব ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পারিশ্রমিক নির্ধারণ করলে বৈষম্য কমবে। একই সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক হলেও কিছু মৌলিক সুবিধা যেমন বার্ষিক বৃদ্ধি, উৎসব ভাতা বা স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষকরা পেশার প্রতি অধিক আস্থাশীল হবেন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব আছে। তারা যদি দীর্ঘদিন ধরে খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে পূর্ণকালীন কাজ করিয়ে নেন, তবে সেটি নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। প্রয়োজন অনুযায়ী স্থায়ী পদ সৃষ্টি ও নিয়মিতকরণের সুযোগ রাখা উচিত। একই সঙ্গে খণ্ডকালীন শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ দিলে তাদের দক্ষতা বাড়বে এবং প্রতিষ্ঠানও উপকৃত হবে।
অবশ্যই বাস্তবতা হলো, সব প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে বড় ধরনের আর্থিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম নাও হতে পারে। কিন্তু ধাপে ধাপে সংস্কার শুরু করা সম্ভব। বাজেট পুনর্বিন্যাস, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস এবং স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা এই প্রক্রিয়ায় সহায়ক হতে পারে। সরকারি পর্যায়ে অনুদান বা প্রণোদনা স্কিম চালু করা গেলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সহায়তা দেওয়া সম্ভব।
সকলের উপলব্ধি হওয়া উচিত  শিক্ষা কেবল পাঠ্যবই বা অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল নয়; এর প্রাণ হলো শিক্ষক। খণ্ডকালীন শিক্ষকরা যদি আর্থিক অনিশ্চয়তায় দিন কাটান, তবে তাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ মানের শিক্ষা প্রত্যাশা করা অবাস্তব। একটি ন্যায্য বেতন কাঠামো কেবল অর্থনৈতিক সমাধান নয়, এটি শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা এবং শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ সুরক্ষার অপরিহার্য শর্ত। শিক্ষককে নিশ্চিন্ত করা মানেই শিক্ষার ভিত্তিকে মজবুত করা। আর সেই ভিত্তি যত দৃঢ় হবে, জাতির অগ্রযাত্রাও তত সুসংহত ও টেকসই হবে।

 

লেখক, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক – বিন্দুবাংলা টিভি, মাসিক+  বনফুল।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি