• সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ০২:৫৪ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
মেঘনায় রতনপুর–তালতলী কাচা সড়ক কাদায় মরণফাঁদ, দুর্ভোগে হাজারো পথচারী অভিশপ্ত বন্যা থেকে মুক্তির পথ কি নেই? স্বচ্ছ পরিকল্পনা বাস্তবায়নেই দূর হবে ঢাকার জলাবদ্ধতা সংকট প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিপীড়ন থেকে মুক্ত করতে হবে নাঙ্গলমোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ শিক্ষার্থীর বৃত্তি অর্জনে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা ঠাকুরগাঁও রোডে পূবালী ব্যাংকের বাংলা কিউআর বুথ উদ্বোধন মীর হেলালের নির্দেশনায় হাটহাজারীতে বন্যার্তদের পাশে ছাত্রদল নেতা তকিবুল বেনাপোল বন্দরে জব্দকৃত ৩ হাজার ৬৭৫ কেজি ভায়াগ্রা পাচারের শঙ্কায় নিরাপত্তা জোরদার গাইবান্ধায় ডিবির অভিযানে ৭০ পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকের নির্বাচন ২৭ সেপ্টেম্বর

অভিশপ্ত বন্যা থেকে মুক্তির পথ কি নেই?

বিপ্লব সিকদার / ৮ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু এবং অসংখ্য নদ-নদীর কারণে বন্যা আমাদের জীবনের এক অনিবার্য বাস্তবতা। প্রতিবছর বর্ষা এলেই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চল বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়। ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, হাসপাতাল—সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বছরের পর বছর একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি দেখে অনেকেই প্রশ্ন করেন অভিশপ্ত বন্যা থেকে মুক্তির পথ কি নেই?
প্রশ্নটির উত্তর সহজ নয়, তবে স্পষ্ট। বন্যাকে পুরোপুরি থামানো না গেলেও এর ভয়াবহতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে বন্যা মোকাবিলায় বেশিরভাগ উদ্যোগই মৌসুমি। পানি নেমে গেলে আলোচনা থেমে যায়, পরিকল্পনা ফাইলবন্দী হয়, আর পরের বর্ষায় আবার একই দুর্ভোগ শুরু হয়।
বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলোর নাব্যতা দিন দিন কমছে। নদী ভরাট, দখল, অবৈধ স্থাপনা, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং দূষণের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে অতিবৃষ্টি কিংবা উজান থেকে নেমে আসা পানির চাপ সামাল দিতে না পেরে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। নদী খনন নিয়ে প্রতিবছর নানা প্রকল্প নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা প্রত্যাশিত ফল দেয় না। কোথাও কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, কোথাও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও জনগণের দুর্ভোগ কমে না।
শুধু নদী নয়, শহর ও গ্রামাঞ্চলের প্রাকৃতিক জলাধারও দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। খাল, বিল, জলাভূমি ও নিম্নাঞ্চল ভরাট করে গড়ে উঠছে আবাসন, শিল্পকারখানা ও বিভিন্ন স্থাপনা। এতে পানি ধারণের স্বাভাবিক সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। একসময় যে পানি সহজে নদী বা জলাভূমিতে চলে যেত, এখন তা মানুষের বাড়িঘর ও রাস্তায় আটকে থাকে। জলাবদ্ধতা এবং বন্যা একে অপরের সঙ্গে মিশে নতুন সংকট তৈরি করছে।
জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অতিবৃষ্টি, আকস্মিক পাহাড়ি ঢল এবং অনিয়মিত মৌসুমি বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যার ধরন বদলে যাচ্ছে। আগে যেসব এলাকায় বড় ধরনের বন্যা হতো না, সেখানেও এখন প্লাবনের ঘটনা ঘটছে। এই বাস্তবতায় পুরোনো পরিকল্পনা দিয়ে নতুন সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো এবং আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা।
বন্যা মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো নদী ব্যবস্থাপনা। নদীকে তার স্বাভাবিক গতিপথ ফিরিয়ে দিতে হবে। অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে নদীর দুই তীর রক্ষায় কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কাগজে-কলমে নয়, বাস্তব মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হবে।
গ্রামাঞ্চলে টেকসই বাঁধ, স্লুইসগেট ও নিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কোথাও বাঁধ নির্মাণের পর বছরের পর বছর রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। ফলে সামান্য চাপেই বাঁধ ভেঙে যায় এবং হাজার হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নির্মাণের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
নগর এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নও অত্যন্ত জরুরি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল দখল, অপর্যাপ্ত ড্রেন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই শহর ডুবে যায়। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের সময় পানি প্রবাহের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা না করলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।
বন্যা শুধু অবকাঠামো ধ্বংস করে না, কৃষিকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কৃষকের বছরের পরিশ্রম মুহূর্তেই পানিতে তলিয়ে যায়। তাই কৃষি খাতে বন্যা-সহনশীল প্রযুক্তি, উন্নত বীজ, দ্রুত ক্ষতিপূরণ এবং সহজ কৃষিঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষক বাঁচলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও শক্তিশালী হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়াতে হবে। নির্ভুল আবহাওয়া পূর্বাভাস, আগাম সতর্কবার্তা, মোবাইলভিত্তিক তথ্যসেবা এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তোলা সময়ের দাবি। মানুষ আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমানো সম্ভব।
বন্যার পর ত্রাণ বিতরণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই শেষ কথা নয়। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখা, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ছবি তুলে ত্রাণ বিতরণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনাই হতে হবে মূল লক্ষ্য।
জনগণের সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নদী দখল, খাল ভরাট কিংবা জলাধার নষ্ট করার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পরিবেশ রক্ষাকে শুধু সরকারের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না; নাগরিকদেরও নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সুশাসন। উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি, নিম্নমানের কাজ এবং রাজনৈতিক প্রভাব যদি বন্ধ না হয়, তবে কোনো পরিকল্পনাই সফল হবে না। জনগণের অর্থ জনগণের কল্যাণে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বাংলাদেশ বন্যাপ্রবণ দেশ—এ সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু বন্যাকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়াও কোনো সমাধান নয়। বিশ্বের অনেক দেশ নদী ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। বাংলাদেশও পারে, যদি পরিকল্পনা বাস্তবমুখী হয় এবং বাস্তবায়নে আন্তরিকতা থাকে।প্রতি বছর একই ক্ষতি, একই কান্না এবং একই প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি আর চলতে পারে না। এখন সময় এসেছে বন্যা মোকাবিলাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখার। নদী রক্ষা, জলাধার সংরক্ষণ, কার্যকর ড্রেনেজ, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন, দুর্নীতিমুক্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং জলবায়ু অভিযোজন এই ছয়টি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠতে পারে নিরাপদ বাংলাদেশ।
অভিশপ্ত বন্যা থেকে মুক্তির পথ অবশ্যই আছে। সেই পথের নাম সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রনীতি, বৈজ্ঞানিক পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্বচ্ছ জবাবদিহিতা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। আজ যদি আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তবে আগামী প্রজন্মকে আর প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে না। এখনই সময় কথার পরিবর্তে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।
লেখক – সাংবাদিক।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন