• মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ০৬:০৭ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

মেঘনায় ভাটেরচর-লুটের চর সড়ক এখন জনদুর্ভোগের প্রতীক

বিপ্লব সিকদার / ৩৭ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত মেঘনা উপজেলার প্রবেশমুখের ভাটেরচর থেকে লুটের চর পর্যন্ত  দেড় কিলোমিটার সড়কটি এখন জনদুর্ভোগ, অব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক উদাসীনতার এক নির্মম উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডরের পাশে অবস্থিত এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ, শিল্পকারখানা তৈরির মালামালবাহী ভারী যানবাহন, শিক্ষার্থী, রোগীবাহী গাড়ি ও পণ্য পরিবহন যান চলাচল করে। অথচ সড়কটি এখন খানাখন্দে ভরা, ভাঙাচোরা এবং চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হলো এই সড়কটি সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগের আওতাধীন হলেও কার্যত এটি যেন “কেউ দেখার নেই” অবস্থায় পড়ে আছে। বৃহত্তর শিল্পপ্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত কুমিল্লা ইকোনমিক জোন-২ এর কারণে এই অঞ্চলে ভারী যানবাহন চলাচল করছে। কিন্তু শিল্পায়নের সুবিধা নেওয়া হলেও অবকাঠামোগত দায়বদ্ধতা নিয়ে যেন কেউ ভাবছে না। স্থানীয় প্রশাসন বলছে সড়কটি সওজের, আবার সওজের কার্যক্রম মাঠে দৃশ্যমান নয়। ফলে জনগণ পড়ে আছে চরম ভোগান্তিতে।এটি শুধু একটি উপজেলার সড়ক নয়; বরং কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একাধিক উপজেলার মানুষের যাতায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ। মেঘনা উপজেলার প্রবেশদ্বার হিসেবে এর কৌশলগত গুরুত্বও অনেক বেশি। অথচ বাস্তবতা হলো—বর্ষা এলেই সড়কে পানি জমে ছোট ছোট গর্ত বড় খাদে পরিণত হয়। শুকনো মৌসুমে ধুলাবালিতে অতিষ্ঠ মানুষ, আর বর্ষায় কাদাপানিতে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে চলাচল। প্রায় প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। মোটরসাইকেল চালক, সিএনজি যাত্রী, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে।
প্রশ্ন উঠতেই পারে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক বছরের পর বছর অবহেলায় পড়ে থাকে কীভাবে? বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে অনেক সময় দায়িত্বের বিভাজনই হয়ে ওঠে উন্নয়নহীনতার বড় কারণ। সওজ বলবে বাজেট সংকট, স্থানীয় প্রশাসন বলবে এখতিয়ার নেই, শিল্পপ্রতিষ্ঠান বলবে এটি সরকারি সড়ক। কিন্তু জনগণ কার কাছে যাবে? জনগণের দুর্ভোগ কি কোনো প্রতিষ্ঠানের দায় নয়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের যেসব অঞ্চলে অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্পকারখানা ও ভারী পরিবহন বৃদ্ধি পায়, সেসব এলাকায় সড়কের সক্ষমতা ও রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা আলাদাভাবে গ্রহণ করতে হয়। কারণ ভারী ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান দ্রুত সড়কের স্থায়িত্ব নষ্ট করে। ভাটেরচর-লুটের সড়কের ক্ষেত্রেও সেটিই হয়েছে। অথচ শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার আগে কিংবা পরে সড়ক উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই সড়কের দুরবস্থা স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, সময় নষ্ট হচ্ছে, যানবাহনের ক্ষতি হচ্ছে। কৃষক তার পণ্য দ্রুত বাজারে নিতে পারছে না। ব্যবসায়ীরা বাড়তি খরচ গুনছেন। জরুরি সেবাও ব্যাহত হচ্ছে। অর্থাৎ একটি দেড় কিলোমিটার সড়কের অব্যবস্থাপনা পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।এ অবস্থায় দ্রুত কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।প্রথমত, অবিলম্বে সড়কটির জরুরি সংস্কার কাজ শুরু করতে হবে। অন্তত ঝুঁকিপূর্ণ গর্তগুলো দ্রুত ভরাট ও চলাচল উপযোগী করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সড়ক ও জনপদ বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং কুমিল্লা ইকোনমিক জোন-২ কর্তৃপক্ষকে নিয়ে একটি যৌথ সমন্বয় কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। কারণ শিল্পকারখানার ভারী যান চলাচল যখন সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে, তখন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে অবকাঠামো উন্নয়নে অংশ নিতে হবে।তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে এই সড়ক প্রশস্তকরণ ও টেকসই পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন। শুধু কার্পেটিং নয়, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ভারী যানবাহন উপযোগী নির্মাণমান এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা দরকার। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে আরও সোচ্চার হতে হবে। কারণ উন্নয়ন কেবল বড় বড় প্রকল্প উদ্বোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করাও উন্নয়নের মৌলিক অংশ।
বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু শিল্পাঞ্চলের পাশের জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক যদি বছরের পর বছর অবহেলায় পড়ে থাকে, তবে সেই উন্নয়ন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। উন্নয়নের সুফল তখন জনগণের কাছে পৌঁছায় না, বরং দুর্ভোগ বাড়ায়।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন